সূর্যমুখীর হাসিতে হাসছে সবাই

আলী আহমদ, জগন্নাথপুর
পরিত্যক্ত জমিতে এখন সোনালী হাসি হাসছে সূর্যমুখী ফুল। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী নারী পুরুষ ভিড় জমাচ্ছেন। কেউ কেউ পরিবার পরিজন নিয়ে ক্যামেরায় তুলছেন গ্রুপ ছবি। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে সেলফি তোলা। বুধবার বিকেলে সরেজমিনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে জগন্নাথপুর উপজেলা সদর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পাগলা-জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের পূর্ব পাশে হাসিনাবাদ হাওরে।
জগন্নাথপুর পৌরসভার জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা কৃষক ওয়াসিম আহমদ ও একই এলাকার শামিম আহমদ মহাসড়কের পাশে এই সুর্যমুখী ফুলের আবাদ করেছেন। হাওরের পরিত্যক্ত ৬ কেদার (৩০ শতাংশ এক কেদার) জমিতে প্রথমবারের মতো এই দুই কৃষক সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন।
সুর্যমুখী ফলানো বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছে গাছে ফুল ফুটেছে। পুরো মাঠ হলদে ফুলে সুশোভিত। দূর থেকে তাকালে যে কারও মনে হতে পারে প্রকৃতি যেন হলুদ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। এছাড়া বাগানের পাশে স্থাপন করা হয়েছে রানী মৌমাছির বাক্স্র। ফুলে ফুলে মৌমাছির গুনগুন শব্দে এক আনন্দদায়ক পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রতিদিন বিকেলে জগন্নাথপুর পৌরশহরসহ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা সূর্যমুখী ফুলের বাগান দেখতে আসছেন।
সূর্যমুখী বাগানে তিন বন্ধুকে নিয়ে ক্যামেরায় ছবি তুলছিল জগন্নাথপুরের জালালপুর গ্রামের তোফায়েল নামের এক তরুণ। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখেছি, অনেকে সূর্যমুখী ফুলের বাগানের ছবি তুলে ভাইরাল করছেন। এই খবর পেয়ে আমরা তিনবন্ধু এখানে এসেছি। হলদে ফুৃলে ফুলে সাজানো এই মনোমুগন্ধকর বাগানে ঘুরে দেখছি আমরা। মনের আনন্দে ছবি তুলছি। খুবই ভালো সময় কাটছে।
বাগানে কথা হয় পৌরশহরের বাসিন্দা জগন্নাথপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, জগন্নাথপুরে সৌর্ন্দয্য পিপাসুদের জন্য কোন পার্ক কিংবা আর্কষণীয় পর্যটক স্পট গড়ে ওঠেনি। এই সূর্যমুখী বাগান আকৃষ্ট করছে জনসাধারণকে। তিনি বলেন, সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন মৃদু রোদে সূর্যমুখী ফুলে এক অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। যেন এক সূর্যের মেলা।
সূর্যমুখী বাগানের দুই চাষি ওয়াসিম আহমদ ও শামিম আহমদ বলেন. স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে হাওরের পরিত্যক্ত ৬ কেদার জমিতে প্রথমবারের মতো এবার সূর্যমুখী ফুল চাষ করি আমরা। সরকারিভাবে সূর্যমুখীর বীজ ও সার বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। তিনমাস আগে আবাদ শুরু করি আমরা। এখন গাছে গাছে ফুল ধরেছে। আরো ১০ থেকে ১২ দিন পর ফুল থেকে বীজ পাওয়া যাবে। তবে এই চাষে ব্যয় নিতান্তই কম। তাঁরা আরো বলেন, সূর্যমুখী চাষে আনন্দ পাচ্ছি। প্রতিদিন লোকজন বাগানে এসে ছবি তুলছেন এবং আমাদের পরিচিতিও বেড়েছে এলাকায়। সূর্যমুখী বাগানের পাশাপাশি সরিষা, তিশি, খিড়া, ভুট্রা চাষ করা হয়েছে। এই মৌসুমী এখানে বোরো আবাদ হয় না। শুধু রোপা আমন হয় এখানে। তাই পরিত্যক্ত জমিতে এবার সূর্যমুখী, ভুট্রা, সরিষা, ত্রিশি, খিড়া চাষ করেছি আমরা কৃষি অফিসের সহযোগিতায়।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, গত বছর থেকে জগন্নাথপুরে সূর্যমুখী চাষ করা হয় মাত্র ২০ বিঘা জমিতে। চাষি সংখ্যা ছিলেন মাত্র ১৫ জন। এবার ব্যাপকভাবে জগন্নাথপুরের হাসিনাবাদ, শেরপুর, মজিদপুর, কলকলিয়া, হামিদপুর, পাটলী, বনগাঁও, শ্রীরামসী, শেওরা, বাগময়না, রানীনগর, হাড়গ্রাসহ জগন্নাথপুরে ২০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ করেছেন ৭০ জন চাষি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব খাতের আওতায় স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে জগন্নাথপুরে এবছর ২০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী হাইসান-৩৩ আবাদ করা হয়েছে। সূর্যমুখী চাষের ৯০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে কৃষকরা সূর্যমুখী ফুল থেকে বীজ ঘুরে তুলছে পারবেন। প্রতি বিঘা জমিনে ছয় থেকে সাত মন বীজ পাওয়া যাবে। বিঘা প্রতি ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করতে পাবেন কৃষকরা। কৃষকদের স্বাবলম্বী করতেই আমরাই সূর্যমুখী চাষে উৎসাহিত করছি।
তিনি আরো বলেন, বাজারে অন্যান্য তেলবীজে যেসব ক্ষতিকারণ উপাদান থাকে সূর্যমুখীতে এসব নেই। বিশেষ করে সূর্যমুখী তেলে কোলেস্টেরল থাকে না। এই তেলের দাম অন্য তেলের চেয়ে একটু বেশি হলেও খুবই উপকারী।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন, সরকার থেকে কৃষককের বিনামূল্যে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ও সার দেয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার এই উপজেলায় বেশি আবাদ হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে জয়প্রিয় হচ্ছে এই সুর্যমুখী।