সেবা গ্রহিতাদের সন্তুষ্টি

পঙ্কজ দে
বদলে গেছে সুনামগঞ্জ কালেক্টরেটের রেকর্ড রুমের পরিবেশ। এখন আর জনগুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরের সামনে সেবা প্রত্যাশির ভিড় হয় না। কোন দালালকে এর আশপাশেও দেখা যায় না। অনলাইনে পরচা নেবার আবেদন করে নির্দিষ্ট তারিখে এসেই পরচা নিচ্ছেন জনসাধারণ। এই পরিবেশ সুনামগঞ্জ রেকর্ড রুমে গেল প্রায় নয় মাস ধরে। জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেনের উদ্যোগের জন্যই এটি সম্ভব হয়েছে বললেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
শান্তিগঞ্জের গাজীনগরের নুরুল আমিন বুধবার রেকর্ড রুমে আসেন এসএ পরচা তুলতে। তার অনলাইন আবেদনে উল্লেখ ছিল পহেলা জুন পরচা নেবার তারিখ। সেই অনুযায়ী পাঁচটি পরচাই এসে হাতে পেয়েছেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের ডেলিভারী পয়েন্টের সামনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বললেন, ‘এতো সহজে পরচা নেওয়া যায়, এটি বিশ^াসই হচ্ছে না।’ তিনি জানান, তিন বছর আগে পরচা তুলার জন্য একজন মহরিকে টাকা দিয়ে চার মাস ঘুরতে হয়েছে তাকে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আচিনপুরের শিরিন আহমেদ, জামালগঞ্জের দুর্লভপুরের উকিল আলী, নিজগাঁওয়ের প্রবীর চন্দ্র রায়ও পরচা হাতে পেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর দিলেন।
সাম্প্রতিককালে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম থেকে প্রতিদিন ২০০ খতিয়ানের পরচা সেবা গ্রহিতাদের তুলে দেওয়া হয়। এটি অতীতে কোন সময়েই এই রেকর্ড রুম থেকে করা হয় নি।
জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম থেকে এসএ এবং আরএস পর্চার জাবেদা নকল, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মোবাইল কোর্টের বিভিন্ন মামলার আদেশের জাবেদা নকল, সহকারী সেটেলমেন্ট অফিস ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের আপত্তি এবং আপিল মামলার জাবেদা নকল, তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা ভূমি সংক্রান্ত যে কোন তথ্য সরবরাহ, নামজারি খতিয়ানের পরচার জাবেদা নকল, নামজারি মোকদ্দমা ও রিভিউ মোকদ্দমা, নামজারি আপিল ও নামজারি রিভিশন মোকদ্দমার জাবেদা নকল, মৌজা ম্যাপ চাইলে সরবরাহ করা হয়।
এই সকল সেবা নেবার জন্য একসময় মহরিরগণের মাধ্যমে সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে ১০ টাকা কোর্ট ফি এবং জরুরি আবেদনের ক্ষেত্রে ২০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে আবেদন করা হত। জরুরি আবেদনের ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যে এবং সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে সাত দিনের মধ্যে চাহিত সেবা পাবার কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহকরা মাসের পর মাস ঘুরতে হতো।
জগন্নাথপুরের খাসিলা গ্রামের কৃপেন্দ্র দে বললেন, সনাতনী পদ্ধতিতে (তিন বছর আগে) আবেদন করে মাসের পর মাস ঘুরেছি, যারা বেশি টাকা দিয়েছে বা প্রভাব খাটাতে পেরেছে, তারা আগে পরচা নিয়েছে। সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির দপ্তর ছিল সুনামগঞ্জ রেকর্ড রুম। এখন সেই দিন বদলেছে, গত কিছুদিন হয়, এখানে এসে সেবা পাচ্ছে মানুষ।
সুনামগঞ্জ রেকর্ড রুমের কর্মরতরা জানালেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সেবা গ্রহিতাদের অনলাইন সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। কিছুদিন ডিজাটাল ও সনাতনী দুই পদ্ধতিতেই সেবা দেওয়া হয়। ২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারি পুরোপুরি অনলাইন সেবা সার্ভিস চালু হয় এখানে।
সেবা নিতে আগ্রহীরা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, পৌর ডিজিটাল সেন্টার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ডিজিটাল সেন্টার থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন। সেবা প্রত্যাশীরা আবেদনের একটি প্রিন্ট কপি নেবেন, ওখানে ডেলিভারী তারিখসহ বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ থাকে। সেই অনুযায়ী প্রিন্ট কপি দেখিয়ে ডেলিভারী কাউন্টার থেকে ডেলিভারী নেবেন আবেদনকারী। নির্ধারিত তারিখে না এসে পরে আসলেও তিনি সেবা পাবেন। কেউ যদি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে তার পরচা বা অন্য প্রয়োজনীয় কাগজ নিজ বাড়িতে পেতে চান, সেই সেবাও আছে, অনেকে সেটিও নিচ্ছেন। তবে সুনামগঞ্জে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে মাসে ৪-৫ জনের বেশি সেবা গ্রহিতা এখনো সেবা গ্রহণ করেন নি।
সুনামগঞ্জ রেকর্ড রুমের উপ-সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র রায় বললেন, বর্তমান জেলা প্রশাসক গেল বছরের ৩রা জানুয়ারি এই জেলায় যোগদান করেছেন। তিনি যোগদানের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সাধারণ মানুষসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সেবা দান কেন্দ্র রেকর্ড রুম যেন জনবান্ধব হয়। এই দপ্তরের শুদ্ধাচারের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি বিভিন্ন ফোরামে কথা বলার সময় রেকর্ড রুমের সেবার বিষয়ে খোঁজ নেন। স্ট্রেক হোল্ডারদের কাছ থেকে সেবা বাড়ানোর বিষয়ে মতামতও নেন। এখানে যারা ভালো কাজ করে তাদেরকে পুরস্কৃত করে উৎসাহিত করেন। রেকর্ড রুমের বিষয়ে নিবিড় মনিটরিং রয়েছে তাঁর। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দক্ষ কম্পিউটার টেকনোলিজস্টদের এখানে পদায়ন করেছেন তিনি। সেবা প্রত্যাশী ও সেবা গ্রহিতার সরাসরি যোগাযোগ তিনি আসার পর একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। যেহেতু অনলাইনে আবেদন করে চাহিত সেবা জেলা প্রশাসকের ডেলিভারী কেন্দ্র থেকে দেওয়া হয়, এজন্য রেকর্ড রুম’এর সামনে যেন একজন সেবা গ্রহিতাকে দেখা যায় না, সেটি বার বারই বিভিন্ন সভায় বলে দেওয়া হয়। এই কর্মকর্তা জানালেন, জেলা প্রশাসকের অফিস কক্ষ থেকে জানালা দিয়ে দেখা যায় রেকর্ড রুম। রেকর্ড রুমের সামনে বহিরাগত কাউকে দেখলে তিনি ফোন দিয়ে জানতে চান, এখানে কারা দাঁড়িয়ে আছেন, অথবা তাঁর গোপনীয় সহকারীকে দিয়ে ফোন দেওয়ান।
রেকর্ড রুমে ১৭ জনের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ১০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী। সম্প্রতি এই দপ্তরে রদবদলের মাধ্যমে দক্ষ কম্পিউটার টেকনোলজিস্টদের পদায়ন করা হয়েছে। তাতে সেবার মান আরও বেড়েছে।
তিনি জানান, এই দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারী কর্তৃক কোন সেবা গ্রহিতা হয়রানির শিকার হলে, কিংবা কোন অন্যায় আচরণ বা উৎকোচ চাওয়ার অভিযোগ দেবারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণশুনানীতে জেলা প্রশাসক এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নম্বরও দিয়ে থাকেন অভিযোগ জানাতে। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)’এর ফোন নম্বরও এই সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, আমি এই জেলায় যোগদানের পর, আমার অফিসের সবচেয়ে বেশি সেবা সাধারণ মানুষ যেই দপ্তর থেকে নেন, সেটি হয়রানিমুক্ত করার চেষ্টা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি এই দপ্তরটি যেন সততার নিদর্শন হয়, নির্ভরযোগ্যতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলবোধ যেন থাকে এই দপ্তরে, সেবা গ্রহিতাদের সঙ্গে আচরণ, অভিযোগ প্রতিকারেও যেন সহযোগিতা থাকে এই দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের। মানুষ যেন হয়রানিমুক্ত সেবা পায় এখানে। যারা এই দপ্তরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে, তাদেরকে শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে।