সোনালী স্বপ্ন গোলাজাত করতে মরিয়া কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্বজিত রায়, (হাওর ঘুরে এসে)
তুমুল ব্যস্ত হাওরের কৃষকেরা। এখন বাঁধ ছেড়ে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সকলে। এই মুহূর্তে সোনালী স্বপ্ন গোলাজাত করতে মরিয়া হয়ে খেতে ও খলায় (ধান মাড়াই স্থান) কাটাচ্ছেন তারা। ডানে-বামে তাকানোর সুযোগ নেই তাদের। কৃষক-কৃষাণী সমানতালে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ফসল ঘরে তোলার কাজে। ছেলেবুড়ো শিক্ষার্থী কেউই ঘরে নেই সবাই ব্যস্ত হাওরে। একেবারে শিশু-কিশোর ও গৃহবধূ থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী-পুরুষ সবাই ঘর ছেড়ে মাথা গুঁজেছেন ফসলের মাঠে। প্রশাসনের পূর্ব সতর্কতা জারির কারণে আধাপাকা ধান কেটে অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এমন আশঙ্কার কথাও উঠে আসছে। হাওর ঘুরে সর্বত্র কৃষকের ঘাম ঝরানো অক্লান্ত ব্যস্ততা চোখে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ক্লান্তিহীন কর্মতৎপরতায় ডুব দিয়েছে পুরো হাওর। এই দুদিন গ্রীষ্মের চিরচেনা রোদে স্বস্তি কাজ করছিল কৃষকের মনে। কৃষক-কৃষাণীর সমান অংশগ্রহণে শঙ্কা কাটিয়ে হাওরের সর্বত্র যেন এক অন্যরকম পরিবেশ বিরাজ করছে। কৃষকের হৈহুল্লোর হাঁকডাকে উৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হয়েছে সবখানে। সোনালী ফসলে ঢাকা পড়া হাওরে কেউ ধান কাটতে গিয়ে খেতে অবস্থান করছেন, কেউ খলায় মাড়াইকৃত ধান রোদে মেলছেন, কেউ খড় শুকানো ও ঝাঁক দেওয়ার কাজও সেরে নিচ্ছেন, কেউবা ধান উড়াতে কোলা হাতে নিয়েছেন, কেউ শুকনো ধান বস্তাবন্দী করতে দেখা গেছে। আবহাওয়া খানিকটা ভালো হওয়ায় হাওর যেন চিরচেনা বৈশাখী রূপে ফেরার চেষ্টা করছে। সেই স্বস্তির মাঝে আধাপাকা ধান কাটাসহ পোকা ধরে ধান নষ্ট হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে কৃষকের মুখে। এছাড়া ধান কাটা শ্রমিকের অভাব, হারভেস্টার মেশিন অতিরিক্ত টাকা চাওয়া, ব্লাস্টের আক্রমণ এবং শিলাবৃষ্টিতে ধান ক্ষতিগ্রস্ত হবার কষ্টও আছে।
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের ধুৎমা গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী জানালেন, চার একর জমির ধান দুদিন ধরে কাটানোর জন্য ঘুরছেন। শ্রমিকও পাচ্ছেন না। হারভেস্টার মেশিনওয়ালারা কাটার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, আগে একরে সাড়ে চার হাজার পাঁচ হাজার টাকায় কাটতো, এখন ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দাবি করছে। তাতেও তিনি কাটাতে রাজি, কিন্তু তার কাছে যে নগদ টাকা নেই, মেশিন ওয়ালারা এবার ধানেও খেত কাটছে না। একই ধরণের মন্তব্য করলেন ধুৎমার ইসলাম উদ্দিন ও জয়নগরের আশরাফ আলী।
এই হাওরপাড়ের ঠাকুরহাটির রফিকুল ইসলাম বললেন,‘আমার খেতের ধান ব্লাস্ট রোগেও ক্ষতি করেছে, পরে শিলাবৃষ্টিতে ও ধরেছে, সাত কেয়ার (দুই একর এক কেয়ার) জমিতে ধান পেয়েছি ৬০ মণ, অন্যান্য বছর হয় ১০০ মণ।’
জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের হালি হাওর পারের হাওড়িয়া আলীপুর গ্রামের বড় কৃষক মো. আয়না মিয়া বললেন, ‘আমি এই বছর চৌদ্দ হাল (১২ কিয়ারে এক হাল) জমি করছি। এই জমিনে বহুত ধান হওয়ার টার্গেট আছিল। কিন্তু টার্গেট পূরণ হইল না। ফসল মাইর গেছে। খরায় নষ্ট হইছে। এরপরে অখন আবহাওয়ার কারণে আধাপাকনা ধানও কাডন লাগতাছে। চৌদ্দ হাল জমির মাঝে প্রায় দশ হাল জমি কাইট্যালাইছি। সারা হাওরে অর্ধাঅর্ধি ধান কাডা হইয়া গেছে।’
এই হাওরপাড়ের দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক মিহির লাল রায় জানিয়েছেন, এ বছর ৪০-৪৫ কিয়ার (১৫ একর) জমি করেছেন তিনি। তবে ধান তেমন সুবিধাজনক হয়নি। প্রথমত পোকায় ধরে কিছু নষ্ট হয়েছে। এরপর কাঁচা-আধাপাকা কাটতে গিয়ে আরেক দফা নষ্ট হচ্ছে। সবকিছু মিলে তেমন লাভ হবে না। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রোদ ছিল, আজ আবার রোদ নেই, আকাশে মেঘ দেখা যাচ্ছে।’ যেভাবে ধান কাটা হচ্ছে যদি দিন ভালো থাকে তাহলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই কাটামাড়াই সব শেষ হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
এই উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও পাগনা হাওর পারের কৃষক কাজল কান্তি তালুকদার বললেন, পাগনা হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে, পুরোপুরি শুরু হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। বৃহস্পতিবার রোদ থাকায় কৃষকের মনে একটু স্বস্তি ছিল। আজ (শুক্রবার) রোদ কম থাকায় কাজের গতি কমে গেছে। তবে দিন এভাবে থাকলে কোন সমস্যা হবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর ২৮ জাতের ধান খারাপ হয়েছে। অন্য জাতের ধান সে রকম খারাপ হয়নি। ভালো আর খারাপ, এখন ধান ঘরে তুলতে পারলেই মঙ্গল।’
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ বছর হাওরে আধাপাকা ধান কাটছে কৃষক, এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় কোন প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বললেন, আমরা ৮০ ভাগ ধান পাকলে সেটাকে শতভাগ ধরে নেই। আর বেশি পাকিয়ে ধান কাটলে কিছুটা ঝরে যায়। ৮০ ভাগ পাকার পর ধান কাটলে সেটা ঝরে না। আরেকটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে মেশিন দিয়ে ধান কাটলে ঝরে পরা কিংবা অন্য কারণে ধান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এতে করে লক্ষ্যমাত্রায় কোন প্রভাব পড়বে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, সুনামগঞ্জে প্রায় দেড়শ’ হাওরে দুই লাখ ২২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৫০ ভাগ। এক লাখ ১১ হাজার ৬৯৪ হেক্টর। জেলাজুড়ে ৫৭৫ টি হারভেস্টার মেশিন, ১০৮ টি রিপার মেশিন এবং দুই লাখ ২৮ হাজার ধানকাটা শ্রমিক কাজ করছে। ঢলে ১৮ হাওর ডুবে পাঁচ হাজার ৭৬৫ হেক্টর ধান ডবেছে। কেবল ডুবে যাওয়া জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা ব্যাহত হবে। অন্যকোন কারণে কোথাও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে না বলে দাবি এই কৃষি কর্মকর্তার।