স্বাগত ২০২১, নিঃশ্বাসে বিশ্বাস রাখি মুখোশোর অন্তরাল ছিন্ন হোক

এবারের খ্রিস্টিয় সন শুরু হয়েছিলো করোনার মহা আতংক নিয়ে। গতকাল বছরের শেষ দিনে এই আতংক একটুও কমেনি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেমন জাতীয় প্রেক্ষাপটেও তেমন। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে বহু তাজা প্রাণ। বাংলাদেশে গতবছর করোনা কেড়ে নিয়েছে বহু জ্ঞানী গুণীসহ সাড়ে সাত হাজার মানুষকে। সারা বিশ্বে করোনায় প্রাণ হানির সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। সবচাইতে হতাশার কথা এই মহামারীর কার্যকর চিকিৎসা কিংবা টিকা; কোনটাই এখন পর্যন্ত মানুষের নাগালে আসেনি। তাই ২০২০ ইংরেজি সনটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে একটি অভিশপ্ত বছর রূপেই বিবেচিত হবে। এই অভিশপ্ত বছরের যে বৈশ্বিক অভিঘাত তা কয় দশকে পূরণ হবে বিশ্ববাসীর বড় চিন্তার বিষয় সেটাই।
আজ ২০২১ সনের প্রথম দিন। প্রথম দিন যদিও মানুষের স্বপ্ন বুননের শুরুর ক্ষণ, প্রত্যাশার লক্ষ্যমাত্রা স্থিরিকরণের দিন, সমৃদ্ধি আর অগ্রগতির সোপান রচনার দিবস; তথাপি আজকের দিনে কেউই এরূপ কোন চিন্তা করতে অক্ষম। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একবাক্যে আজকে কেবল একটিই কামনা করছে, ২০২১ সনটি হোক মহামারী বিদায়ের বছর। আমরাও তাই চাই। অণুজীব জীবের উপর রাজত্ব করুক, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অদৃশ্য এক মরণকোষ মানবসভ্যতাকে ত্রস্ত করে রাখুক; এমন দুর্বিষহ সময়চক্রের অবসান ঘটানোটাই হলো আমাদের আসল লক্ষ। এই লক্ষ হাসিল হলেই কেবল নতুন বছরকে শুভ ও কল্যাণকর বলা সম্ভব।
অবশ্য একটি আশ্চর্য পরিসংখ্যান এই, করোনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কাবু করতে পারেনি সামষ্টিক অর্থে। এই বছরে অর্থনৈতিক সূচকগুলো উর্ধগামী থেকেছে। কমেনি রেমিটেন্স। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বন্ধ হয়নি কোন মেগা প্রকল্প। পদ্মা সেতু সমাপ্তির দিকে। অর্থনীতির এই তেজিভাব করোনাকালে বজায় রাখা কী করে সম্ভব হলো তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। এই তেজিভাব টেকসই থাকবে নাকি আকষ্মিক মুখ থুবড়ে পড়তে পারে; তাও আরেক চিন্তার বিষয়। তবে চোখের সামনে যে সফলতা সেজন্য আমাদের সংগ্রামী জনগণ ও সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার।
স্বাস্থ্যখাতের অমানবিক ও নির্দয় দুর্নীতি এবং অদক্ষতা বছরজোরে ছিল আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রে। করোনার শুরুতে যে সীমাবদ্ধতাগুলো আমরা দেখেছিলাম,
পরিমাণগত সামান্য হেরফের ব্যতিরেকে সেখানে গুণগত পরিবর্তনের কোন দেখা মিলেনি। মহামারী নিয়ে বেপরোয়া বেনিয়াবৃত্তি মানুষ হিসাবে আমাদের আরও হেয় করেছে। এবছরের দ্বিতীয় মাস থেকে করোনার টিকা আমদানির যে কথা সেখানে বেনিয়াবৃত্তি কতোটা সর্বগ্রাসী হতে পারে তা দেখার ব্যাপার বটে।
মহামারীর সংকটকালে জাতীয় সক্ষমতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করার এক ভীষণ নেতিবাচক প্রবণতা আমরা লক্ষ করেছি অবাক বিষ্ময়ে। প্রথমে নানা চাতুরতার মাধ্যমে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের করোনার এন্টিজেন ও এন্টিবডি পরীক্ষার কিটকে আটকে দেয়া হয়। এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের করোনার টিকা বঙ্গভ্যাক্সকেও একই কায়দায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই দুইটি ঘটনা প্রমাণ করে আমরা জাতীয় অর্থনীতি ও মর্যাদাকে স্থায়িত্ব দেয়ার পরিবর্তে আমদানি নির্ভরতাকেই পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। এমন মনোভাব আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকারক, নতুন বছরে এই বুধোদয় ঘটুক তাহলেই স্বস্তি।
শত হতাশার মাঝেও মানুষ আশাবাদী জীব। হতাশা কাটুক, অনিশ্চয়তা কাটুক, ভয় দূরীভূত হোক, মুখের মুখোশের অন্তরাল ছিন্নভিন্ন হোক, পরষ্পর আমরা বুকে বুক রাখি, নিঃশ্বাসে বিশ্বাস রাখি; নতুন বছরে এই কামনা। শুভ নববর্ষ।