স্রোতের বিপরীতে আজীবন লড়াই করেছেন

সাইদুর রহমান আসাদ
বিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে জন্ম বদরুল ইসলামের। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের সময় তার বয়স সাত। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার চক্রান্তের সময় জাতীয়তাবাদের বোধ প্রথম জন্ম হয় তাঁর। দেশ হলো জননীর মতন, সে জননীর অপমান মানতে পারেন নি ১২ বছর বয়সি বদরুল ইসলাম। প্রচন্ড অভিমান নিয়ে সহপাঠিদের সাথে সময় কাটতো তখন।
তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়াবিহীন সেকালে ৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর ৪ দিন পর শুনতে পান। সাথে সাথে প্রতিবাদ ক্ষোভে উদ্বেলিত হন তিনি। সুঠাম দেহের অধিকারি বদরুল ইসলাম তখন তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র।
৭১ তিনি মেট্রিক পরীক্ষার্থী। একই বছরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে পরীক্ষা দেয়া হয়নি তার। যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তাহিরপুর মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। গান, নাটক ও আবৃত্তিতে পারদর্শী বদরুল ইসলামকে ক্যাম্পে রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়। রান্না করার পাশাপাশি ক্যাম্পের যাবতীয় কাজ বদরুল কে করতে হতো। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে সুস্থ করতেন তিনি। পাক মিলিটারীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ না নিলেও পেছন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। গান-নাটকে দেশ প্রেমে উজ্জীবিত করেছেন সহযোদ্ধাদের।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে নতুন করে যোগ দেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। যোগ দেন যাত্রা দলে। বলাকা সহ অসংখ্য যাত্রা দলে কাজ করেছেন। সে সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা দেশে। দীর্ঘ ২৩ বছর সংস্কৃতি জগতে থাকার পর বিদায় নেন সেখান থেকে। এছাড়াও তিনি তাহিরপুর ক্রীড়া সংস্থার প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তার হাতে গড়া অনেক খেলোয়ার ফুটবলকে ভালোবেসে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। অনেকে চাকরী করছেন বিভিন্ন দপ্তরে।
তাহিরপুরে ওস্তাদজি নামে পরিচিতি তিনি। তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষ ওস্তাদজি বলে সম্বোধন করতো বদরুল ইসলামকে।
বয়সের ভারে সুঠাম দেহের অধিকারি বদরুল ইসলামের শেষ দিকে সকাল বেলা হাত দুটি পেছনে নিয়ে ধীরে ধীরে বাজারের হোটেলে খেতে যেতেন। এর র যেতেন যৌবনে পায়ের দাপটে বলকে কাবু করা খেলার মাঠ ‘তাহিরপুর উপজেলা স্টেডিয়ামে’। সেখান থেকে আবারো বাজারে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে, রাতের জন্য টিফিন বন্দি করা খাবার নিয়ে রওয়ানা দিতেন বাড়ির দিকে। এটাই তার প্রতিদিনের রুটিন ছিলো।
ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ সবসময় সোচ্চার ছিলো। এজন্য পরিবার ও সমাজ থেকেও বিচ্ছিনভাবে জীবন কাটিয়েছেন, তবুও আর্দশের সঙ্গে আপস করেন নি। মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে এই বীর সেনানী তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে গেলেন। তবে আমাদের জন্য রেখেগেছেন তাঁর লড়াই। তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক : সাংবাদিক