হতাশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই আছে গ্যাস সংকটও

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের মতো এতো বেশি পিছিয়ে থাকা বিসিক শিল্পনগরী দেশের আর কোথাও নেই। পাশের জেলা সিলেটে দুটি বিসিক শিল্পনগরী গড়ে ওঠেছিল। কোনটিতেই বিক্রি করার মতো প্লট নেই এখন। ওখানে আরেকটি শিল্পনগরী করার দাবী ওঠেছে। চট্টগ্রামের মিরেরসরাই উপজেলায় গত বছর সুনামগঞ্জের মতো একই সুযোগ সুবিধা নিয়ে শিল্পনগরী করা হয়। ওখানে একটি প্লটও শূন্য নেই। অথচ. ১৩ বছর আগে গড়ে ওঠা সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী’র প্লট বরাদ্দের জন্য এবং যারা প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন, তাদেরকে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য বার বার যোগাযোগ করেও কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এমএন আসিফ এমন মন্তব্য করেই সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী গড়ে ওঠার ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করলেন। শনিবার শিল্প সচিব মো. আব্দুল হালিম সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরী পরিদর্শনের সময় বলেছেন, সকল প্রকার সহযোগিতা দিয়ে এই শিল্পনগরীতে শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা শহরের ওয়েজখালিতে ১৯৯০ সনে স্থাপন করা হয় বিসিক শিল্পনগরী। ২০০৭ সাল থেকে প্লট বরাদ্দ শুরু হয়। এখানে ১১৬ টি শিল্প প্লট রয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮৮ টি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। এখনও খালি পড়ে আছে ২৮ টি প্লট। যারা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম করে ৮৮টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন, তাদের অনেকেই ওখানে কোন মিল ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন নি। এই বছরের শুরুতেই ১৬ জন প্লট মালিককে চিঠি দিয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরা হলেন- পদ্মা সিরামিক এ- টাইলস ইন্ডাস্ট্রিজ, মিলন-সম্পা এগ্রো প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিজ, টিটু ফুড ইন্টাস্ট্রিজ, মেসার্স আফরোজা ফুডস, নাদিরা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স সৈয়দ ট্রেডার্স, সজীব অটো পালস প্রসেসিং, রিচমুন ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, ওসমান ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, মাহিম ওয়েল মিল, রহমান ফ্লাওয়ার মিল, মাইক্রো ট্রেড ইন কর্পোরেশন লিমিটেডের ৩ টি প্লট ও সাদ্দাম অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ।
দ্রুত শিল্প কারখানা চালু না করলে তাদের নামে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্প নগরীতে বেকারি, ফুড ইন্ডাস্ট্রি, ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রি, স্টিল ফার্নিচার, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রি, কটন রিফাইন ফ্যাক্টরি, ময়দা মিল, টাইলস ইন্ডাস্ট্রি, সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি, এলোমনিয়াম ইন্ডাস্ট্রি, পাইপ ইন্ডাস্ট্রি, পাওয়ার সোলার ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি শিল্প স্থাপনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোক্তারা প্লট বরাদ্দ নিলেও বাস্তবে উল্লেখ করার মতো কোন শিল্প ওখানে গড়ে ওঠেনি।
একটি বেকারী, একটি ময়দা মিল, মেশিনের পাম্প এবং বিশুদ্ধ পানির একটি কারখানা ছাড়া ওখানে উল্লেখ করার মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
উদ্যোক্তারা জানালেন, উৎপাদিত পণ্যের বাজার ছোট, গ্যাস প্রাপ্তিতে হয়রানি, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা, ব্যাংক ঋণ পেতে জটিলতা, নিরাপত্তার অভাবসহ নানা কারণেই ওখানে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠছে না।
স্থানীয় উদ্যোক্তা আবুল কালাম জানালেন, ১০ বছর আগে বিসিক শিল্পনগরীতে তিনি প্লট নিয়েছিলেন। প্রথম সেখানে ক্যামিকেল ইন্ডাষ্ট্রি করেছিলেন। সাবান, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপজল তৈরি করে বিক্রি করতেন। কিছুদিন চালিয়ে লোকসান গুণতে হয়েছে তাকে। ঢাকা থেকে কাঁচামাল এনে এবং গ্যাস না থাকায় লাকরি দিয়ে চালিয়ে উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় মূল্যে পোষায় না। পরে ব্যবসা পরিবর্তন করে মসলার মিল এবং ধান ভাঙানোর মিল করেছেন। গ্যাস সংযোগ পেতে নানা হয়রানির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্যাস আনা সম্ভবই নয়।
জালালাবাদ গ্যাসের সুনামগঞ্জের ম্যানেজার নুরুজ্জামান জানালেন, বিসিক শিল্পনগরীতে গ্যাস পেতে হলে জালালাবাদ গ্যাসের সিলেট আঞ্চলিক অফিসের পরিকল্পনা বিভাগ থেকে আবেদন ফরম নিয়ে জ¦ালানী ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা বরাবরে আবেদন করতে হবে। ওখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রাক্কলন তৈরি করে দেওয়া হবে। শেষে টাকা জমা দিলে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এমএন আসিফ জানালেন, সুনামগঞ্জের সাথে একই সঙ্গে গড়ে ওঠা নোয়াখালী বিসিক শিল্পনগরী জমজমাট হয়ে ওঠেছে। ওখানে কোন প্লট শূন্য নেই। প্রতিটি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা চাচ্ছি আমরা, কিন্তু আশানুরূপভাবে এগুচ্ছে না। এখানে বিদ্যুৎ ও পানির কোন সমস্যা নেই। গ্যাস সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রিতা আছে। এটি সহজ করা গেলে ভাল হয়। ১৬ জন উদ্যোক্তাকে বছরের শুরুতেই বরাদ্দকৃত প্লটে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ২-৩ জন কাজ শুরু করেছেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল হালিম শনিবার বিসিক শিল্পনগরী পরিদর্শনে আসেন। এসময় তিনি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠুক। এজন্যই শিল্পনগরী তৈরি করে দেওয়া। শিল্পনগরীতে কোন সমস্যাই থাকবে না। শিল্পবান্ধব শিল্পনগরী করে দেয়া হবে। দেশে একশ ইকনোমিক জোনও করা হচ্ছে। এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যান্য জেলার শিল্পনগরী যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সুনামগঞ্জেরটাও সেভাবে এগিয়ে যাবে।