হাওরের কৃষি- ‘অধিক ফলন-কম দাম’ সংকট থেকে মুক্তির পথ

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার
বছরে সারাদেশে সোয়া চার কোটি টন ধান উৎপন্ন হয়। আউশ-আমন দেশের বৃহৎ ফসল ছিলো। বোরো হাওর এলাকার ধান, সামান্য এলাকার ফসল হিসেবে দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটাতে কিঞ্চিত সহায়ক ছিলো। দেখতে দেখতে ৮০ সাল থেকে মাত্র তিন/চার দশকের মাথায় বোরো উৎপাদন আমনকে ডিঙ্গিয়ে সোয়া দুই কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। আর কোনো ফসল ফলে না বিধায় হাওরের কৃষক বোরো ধান চাষ করতো। বোরো মৌশুমে দেশের অন্য এলাকায় কোনো কাজ না থাকায় অনেক জেলার ভাগালু শ্রমিক মন্দের ভালো মনে করে ধান কাটতে আসতো। শুধু ধান কাটতেই আসতো না, বোরোচাষীকে অর্থের যোগান দিয়ে গৃহস্থি শুরুর দুঃশ্চিন্তা নিরস্ত করতো, ফসল উঠার পর সুসময়ে টাকাটা ফেরৎ নিতো। অবশ্য কৃষক তার মাচা খালি করে বেপারির ঋণ পরিশোধের পর শূন্যগোলায় শূন্য হাতে সারা বর্ষা শুধু বসতবাড়ি পাহারা দেওয়াই কাজ ছিলো। সেই আদিকাল থেকেই হাওরের কৃষক ঠকে ঠকে নাকের ডগায় দম নিয়ে কোনো রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে, এখনও করছে। আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা সমাজের খাদ্য যোগানদাতা কৃষককে কী দিয়েছে? পাকিস্তান সরকার থেকে কৃষককে দেবার বেলায় বাইদ্যার চিমটিতে কিছু দিয়েছে। কোনো সরকারই প্রাণখুলে ভবিষ্যত উন্নতির চিন্তা করে কিছু দেয়নি। বাষট্টি সনের একটি দৃশ্য মনে পড়ে ভোর ছ’টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদিনে ধানের দাম দশ টাকা থেকে বিশ টাকা হয়েছিলো। সারা ভাটির এলাকায় ডিডি পড়ে গিয়েছিলো সেবছর হাওরাঞ্চলের অনেক গ্রামের কিছু বাড়িতে লাখের বাতি জ্বলেছিলো। কেননা পাঁচশ’ থেকে দু’হাজার মণ পর্যন্ত ধান পাওয়ার মতো গৃহস্থ-কৃষক প্রায় প্রতি গ্রামেই দু’-চারজন করে ছিলো। তাও পরবর্তীতে ধানের দামের ব্যাপারটি আর এগোয়নি, পরের বছরগুলিতে বারো থেকে পনেরো টাকা বড়জোর আঠারো টাকা দাম উঠেছে। কিন্তু বিশ টাকা ছাড়িয়ে বাইশ টাকা হতেই সরকারের গায়ে খুব কষ্ট অনুভূত হয়েছিল বেশি হয়ে যাচ্ছে মনে করে টেনে রেখেছে। একজন ব্যবসায়ী, সেও কৃষকের ধানের দাম-কৃষকের ভালো আর্থিক অবস্থাটা সহ্য করতে পারে না। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে মধ্যঃ¯¦ত্বভোগীরা মাঝখানের মুনাফাটি পকেটস্থ করে। অর্থনীতি যারা বুঝেন তাদের এটা সহজেই বুঝার কথা দেশের ‘বৃহত্তর সমাজ কৃষকে’র হাতে টাকা হলেই তো তার দোকানে বেঁচা-বিক্রি বাড়বে, অন্য বিক্রেতা ব্যবসায়ী, উৎপাদকদেরও তখন বেঁচা-বিক্রি বাড়বে। কৃষককে কম দিয়েই খুশি আমাদের অবুঝ শিক্ষিত সমাজ। বলে লিখে বুঝানো কঠিন, বাস্তবতা না দেখলে বুঝা সহজ হয় না। কৃষক, ওরা দুর্বা বনের মতো অভিশাপ মাথায় নিয়ে মরে মরে কিভাবে জানি বেঁচে থাকে, ভাবাই অবান্তর।
২০১৭ সালের হাওর বিপর্যয়ের পর গত চার বছর যাবৎ হাওরে অধিক মাত্রায় ফসল হয়েছে। বলা যায়, বিগত দশ বছরের মধ্যে এমন গোলা-শুকনো ধান মাড়াই করে কৃষক নির্বিবাদে এমন ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। কৃষকের তাতে খুব আনন্দ, নতুন পরিকল্পনায় আগামীর চিন্তা করছে। আলামত পাওয়া যাচ্ছে ক’দিন পরই ঘরে ঘরে হা-হুতাশ শুরু হবে। কেননা প্রথম বাজারেই নতুন ধানের দাম উঠেছিলো প্রায় বারো শ’ টাকা, আজ এক সপ্তাহের ব্যবধানেই আট শ’/ সাত শ’ টাকায় নেমে এসেছে। বাকি সময়ে কত নিচে নামবে কৃষক তা জানে না। গত আঠারো/ঊনিশ সনে প্রচুর ফলন হয়েছিলো এবং পরিমিত শুকনো ধান কৃষক সাড়ে চার শ’ থেকে শুরু করে মাঝ বর্ষা পর্যন্ত সাড়ে সাত শ’/আট শ’ টাকা মণ বিক্রি করতে পেরেছে। ভাটির হাওরে প্রতিমণ ধান ফলাতে যেকোনোভাবে হিসেব করলেও খরচ পড়ে সাড়ে ন’ শ’ থেকে একহাজার টাকা। জমির ভাড়া এবং কৃষক ও তার পরিবারের লোকজনের পারিশ্রমিক হিসেবে ধরলে বারো শ’ টাকা উৎপাদন ব্যয় হয় তাতে কোনো ভুল নেই। অথচ এ বছরগুলিতে কৃষককে মণপ্রতি সাড়ে তিন থেকে চার শ’ টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। অতীতেও এভাবে লোকসান দিতে দিতেই বড় কৃষক মাঝারি হয়েছে, মাঝারি কৃষক প্রান্তিক কৃষক হয়ে ক্ষেতমজুরে পরিণত হয়েছে। সরকার ক্রয়কেন্দ্রে মণপ্রতি হাজার চল্লিশ টাকা দাম নির্ধারণ করে দিলেও সব কৃষক ধান বিক্রি করার সুযোগ পায়নি। জেলায় তিন লাখ ছেষট্টি হাজার কৃষক থাকতেও লটারি করে মাত্র বারো শ’ কৃষক নির্ধারণ করে তাদের আধ-টন মানে সাড়ে তেরো মণ ধান কিনেছে। সবচেয়ে ছোট কৃষক মানে তৃণমূল কৃষকও বৈশাখে এক থেকে সোয়শ’ মণ ধানের মালিক হয়। একৃষক খোরাক রেখে সত্তর-আশি মণ ধান সরকারি দামে বেচতে পারলে প্রায় লাখ টাকার মালিক হতে পারে, অনেক ঝামেলা মিটিয়ে দিনবদল করে নিতে পারে। তার তেরো মণ ধান সরকারি দামে বিক্রি করলেই কি, না করলেই বা আর কতটুকু মরে যাবে। সার্বিক চিন্তায় বলতে হয় এমন নিয়ম-কানুন কৃষকের সাথে পরিহাসের শামিল। কিন্তু কেন এই ঠাট্টা ? এর মূল কারণ হলো ক্রয়কেন্দ্রে ধান ক্রয়ের নামে সরকারি পোষ্য কিছু লোককে অর্থ লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া। কীভাবে? জেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষকের কৃষিকার্ড এবং দশ টাকায় একাউন্ট করে দিয়ে কৃষকের মন কেড়েছিলো যা বুমেরাং হয়েছে। এই কৃষিকার্ড কিনে পোষ্যরা গোডাউনে ধান বেঁচে কৃষককে চার পাঁচ শ’ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভালো উপার্জন করতে পেরেছে, কৃষক চেয়ে চেয়ে শুধু ক্ষমতার লীলা দেখেছে।
কৃষকের আর এক নির্যাতনের নাম ‘ডা-ি’র মার। সারাদেশেই ফড়িয়া-কয়ালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকের ধান কিনে আসল দামে মোকামে বিক্রি করলেও শতকরা পঁচিশ তিরিশ মণ ধান লাভ থাকে। শতকরা পাঁচমণ বেশি নিলেও গৃহস্থ স্বেচ্ছায় ঘাটতি হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু না কৃষকের সামনেই কাঠের ডান্ডি’র ফাঁকে সরকারের তদারকির অন্তরালে কয়াল-ফড়িয়ারা পুকুর-চুরি করে। এটার নাম সিস্টেম লস নয় নিরেট চুরি, কিন্তু দেখার কেউ নেই। আশির দশকে দেখেছিলাম অভিযান, তবু বাটখারা (সের) ছাড়াতে এক দশক লেগেছিলো কিন্তু এই ডা-ির বদলে নিক্তি বা ওভারি’র প্রচলন দেখতে চলতি শতাব্দী শেষ হবে কিনা ভাববার বিষয়। অথচ এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে বিদ্যুৎ নেই, তাহলে মিটার বা ওভারিতে ধান মাপা বা কেনা-বেচার জন্য তো একটি সরকারি নির্দেশই যথেষ্ট। কৃষক বা গ্রামবাসী লজ্জা আর অপমানের ভয়ে প্রতিবাদ করে তার উপায় নাই কেননা এদের সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, কোনো কয়াল বা ফড়িয়া তার ধান কোনেদিনও কিনবে না। এতে পরিবারের কাছে, গ্রামের কাছে, প্রতিবেশির কাছে অনেক হেয় হতে হবে অনেক কটু কথা শুনতে হবে। ফলে সামাজিক জীবনে একজন কৃষক ও কৃষক পরিবারের এর চেয়ে অপমান আর কিছু নেই। তাই চোখের সামনে ডাকাতি করুক আর মাথায় কুড়াল মারুক কেউ সাহস করে প্রতিবাদ করে ‘একঘরে’ হতে চায় না। মোদ্দাকথা সব ক্রেতা-বিক্রেতা, রিক্সা-সিএনজি, বাস-ট্রাক, অফিস-আদালত, ডাক্তার-নার্স, উকিল- মোক্তার সবার সিন্ডিকেট আছে শুধু মাটিখুঁড়ে উৎপাদনকারী গোষ্ঠী কৃষকই কোনো সিন্ডিকেট করতে পারে না। বলতে পারে না ‘আমরা ধান বেচবো না, ধান উৎপাদন করবো না’। এমনটি করতে গেলে সবার আগে নিজেই আটকে যায়, ঠেকে যায়, কেননা তার পেছনে সরকার বা সরকার জাতীয় কোনো শক্তি নেই। কৃষক-সংগঠনগুলি এমন ‘সূক্ষ্ম অথচ গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় নিয়ে ভাবেই না। তাদের উদ্যোগে কোনো কোনো দেশে সংগঠিত গুদাম সমবায়, বিক্রয় পরিবহন, ই-মার্কেটিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু সেজন্য চাই দক্ষ ও সৎ কৃষক সংগঠন ও নেতৃত্ব। আর সরকার যদিও কথায় কথায় বলে কৃষি-নির্ভর দেশ, কৃষক জাতির মেরুদ-, দুঃখের বিষয় হলো এই মেরুদ- পেছনে থাকে তো, তাই কৃষক চোখে পড়ে না। আর সরকার কথায় কথায় নিজেকে বলে কৃষি-বান্ধব কৃষক-বান্ধব, কাজে-অর্থে ব্যবসায়ীকেই নানা অছিলায় সহযোগিতা করে। তাদের হাতেই গ্রামীণ ক্ষমতা কাঠামো বন্দী হয়ে আছে। এমনই লজ্জার মুখে, এমনই বিপদে, এমনই অনিরাপদ-অরক্ষিত, অবহেলা- অবজ্ঞা, বঞ্চনা-প্রবঞ্চনার মধ্যে দেশের কৃষি, কৃষক ও গ্রামীণ জীবন ধারা যুগ যুগ ধরে চলছে।
অন্য ক’টি বিষয়: মিলকারখানা’র মালিক তার উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করে বাজারজাত করতে পারে। রাষ্ট্র বা সরকার তা সাদরে মেনে নিয়ে ক্রেতাকে ছবক দিতে পারে। তাহলে কৃষক কেন তার উৎপাদিত পণ্যের পর্তা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করতে পারে না!! তার দেশের সরকার, তার ভোটে নির্বাচিত সরকার কেন তা যৌথভাবে নির্ধারিত দামকে সমর্থন করে না, কেন তা বিশ্বাস করে না। এক কেয়ার বা এক হাল জমি চাষ করতে তার পরিবারশুদ্ধ সবাইকে নিয়ে কতটুকু খরচ টানতে হয়, নিরেট জমিচাষে তার কতটুকু ব্যয় হয়, তার উৎপাদিত ধান কতমণ হয় এটা তো একমাত্র কৃষকই জানে। আর এই উৎপাদন অনুপাতে একমণ ধান কত বেচলে তার আগামী বছরের সংসার খরচ-গৃহস্থি খরচ সংকুলান করতে পারবে সে হিসাব, সিদ্ধান্ত নেওয়া তো তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু না, সে তা পারে না। সরকার বলে দেয় এবছর ধানের দাম হবে নয়শ’ টাকা, এক হাজার চল্লিশ ইত্যাদি টাকা। সরকার কি তার বাড়ি এসে খরচের হিসাব নিয়ে গেছে যে সে হিসাব করে পর্তা বুঝে দাম ফেলবে? তাহলে এটা কী করে হয়? আর হিসাব করে খোঁজ নিয়ে দেখুন দেশে সব ব্যবসায়ই শতকরা বিশ পঁচিশ টাকা সরকার স্বীকৃত বৈধ লাভ করে। তাহলে কৃষকের একমণ ধান ফলাতে বারো শ’ টাকা ব্যয় হলে তো, সেও মণপ্রতি তিন শ’ টাকা লাভের আশা করতে পারে। দেশে তো অনেক রাজনৈতিক দলের অনেক বড় বড় নেতা আছেন, চেহারায় পোশাকে-আশাকে দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বড় মনে হয় অনেকে আবার নিজেকে গণনেতাও ভাবেন, কেউ কি এমনটা কোনো দিনও ভেবেছেন! কোনো বক্তৃতায় বক্তব্যে এই অদৃশ্য যন্ত্রণাগুলির কথা বলেছেন! বলেন নাই, বলবেন না কারণ তারা উপরের স্তরের উপরিভাসা নেতা, বাউন্ডারি ধরে ধরে কথা বলেন। এত কথা বলছি মনের যন্ত্রণায়, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়। আসলে ব্যবস্থাটি পাল্টাতে হবে। নতুন প্রতিষ্ঠান ও নতুন সংগঠন চাই।
যা বলছিলাম, চারটি সোনার বৈশাখের ১৪২৮ বঙ্গাব্দের চতুর্থটিতে হাওরের কৃষকের ভাগে রাষ্ট্র কী বরাদ্দ করেছে তাই দেখার বিষয়। ’২৫,’২৬ বঙ্গাব্দ, ’১৮,’১৯ ইং সনে ধানের দাম নিয়ে কৃষকের হয়রানির কথা বলেছি। প্রায় শত পরিবারে খোঁজ নিয়ে জেনেছি এ দু’বছরে প্রত্যেক কৃষক গৃহস্থি করে ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। ’১৭ সনের হাওর দুর্যোগের পর প্রায় ষাটটি গ্রামে কৃষকসভা করে তথ্য নিয়ে দেখেছি প্রতিটি গ্রাম গড়ে পঞ্চাশ লাখ থেকে আড়াই কোটি টাকা পুরনো ঋণ মাথায় নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে। অনুপাতটি হলো এমন প্রতি পঁয়ত্রিশ পরিবারের গ্রামে পঁচিশ থেকে আটাশ লাখ টাকা পুরনো ঋণ। সে হিসেবে গ্রাম যত বড়, ঋণের পরিমাণ তত বড়। এই হলো গ্রামের চিত্র।
আসি ২০২০ সনের কথায় অনুজীব করোনাভাইরাসের কারণে দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় গতবছর ব্যবসায়ীমহল ভবিষ্যতের লাভের চিন্তায় ধানের দাম বাড়িয়ে ধান কিনেছে। এরও মূলে হলো করোনার কারণে সরকার কোনো দেশে চালের এলসি করতে পারে নাই। ফলে চাতাল মালিকরা সরকারি গোডাউন রেট ছাড়িয়ে সাড়ে বারো শ’/তেরো শ’ টাকা পর্যন্ত দামে ধান কিনেছে। ফলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র তার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা বারো তেরো শতাংশেরও কাছাকাছি যেতে পারেনি। তাহলে কি পাওয়া গেলো- দেশীয় কৃষকের মূল শত্রু এলসি’র মাধ্যমে বিদেশি চাল আমদানি!!! আমাদের বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, স্থানীয় ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’, ‘হাওরের কৃষি ও কৃষকরক্ষা সংগ্রাম পরিষদে’র প্রতি সাধারণ কৃষকের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে। তাদের ধারণা আমাদের সভা-সেমিনারের ফলেই ধানের দাম বেড়েছে। আর যাই হোক, তাতে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক জোত-বন্ধকী কিছু জমি কিনতে পেরেছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো ২০২১ ইং, ১৪২৮ বাংলায় যদি এ দাম না পায় মহা-পরীক্ষায় পড়ে যাবো। ফসল কাটার প্রথম বাজারেই প্রায় বারো শ’ টাকা ধানের দাম হয়েছিলো। আস্তে আস্তে তা নিচের দিকে নেমে আসছে। কৃষি-সম্প্রসারণ অফিস এবারও বাম্পার ফলন- বারো লাখ মে:টন আশা করছে। অপরপক্ষে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে জানা গেছে, গোডাউন রেট কিছু বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ধান কেনার সময়সীমা এখনো জানা যায়নি। যেসব এলাকায় ধান কেনা হবে সেখানে প্রচারের কথা বলা হয়েছে। তা যদি আরও দু’মাস দেরি হয় গরিব কৃষকের ধান তো ঋণ পরিশোধে বিক্রি করতেই বাধ্য হবে। সুতরাং এবারেও বিদেশি এলসি করার পাঁয়তারা চলছে কিনা, দিন গেলে বুঝা যাবে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পেরে গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কী করলে সরকারি গুদামে কৃষক ধান দেবে পরামর্শ চেয়ে জেলা প্রশাসন, জেলা খাদ্য গুদাম, সাংবাদিকগণ কথা বলেছে। আমরা কিছু শর্ত মানার শর্তে কথা বলেছি, তা নিচে আলোচনা করছি। সবার থেকে ক্রয় করা হয়তো এখনই সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রত্যেক কৃষকের ধান কিনতে হবে লটারির মাধ্যমে তালিকা নির্ধারণ করে, কৃষককে হাস্যাস্পদ করা যাবে না। কৃষকের জন্য লাভজনক দাম বজায় রেখে চাল আমদানির বিদেশি এলসি’র অনুমোদন আস্তে আস্তে কমাতে হবে। এক ফসলী এলাকায় উৎপাদিত ধানের অর্ধেক সরকারকেই নির্ধারিত সঠিক দামে কিনতে হবে। খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করবে, সে সব কৃষককে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, সরকারি যেকোনো প্রণোদনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্থানীয় কৃষকের দাবি পর্যাপ্ত পরিবহণ সুবিধা নেই সুতরাং ইউপি মেম্বার-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে তিন শ’ টাকার স্ট্যাম্পে ব-সই নিয়ে পহেলা এপ্রিল থেকে কৃষকের চাহিদামত ধানের অর্ধেক দাম ব্যাংক একাউন্টে পরিশোধ করতে হবে। তাতে কৃষকের শুণ্য হাতে ধান কাটার শুরুর সময় অধিক সুদে ঋণ করতে হবে না। পরে পানি ভাসলে ক্রয়কেন্দ্র মণপ্রতি ত্রিশ/চল্লিশ টাকা খরচ কাটিয়ে ফড়িয়া দিয়ে কৃষকের বাড়ি বাড়ি থেকে ধান সংগ্রহ করবে। অতি দ্রুত পর্যায়ক্রমে হাওরের গোপাটগুলি পাকা করে মূল সড়কে যুক্ত করতে হবে। ফলে ক্ষেত থেকে ধান পরিবহণ সহজ হবে ও বৃষ্টি-বাদলের বছরে অটো-রাইচমিলে ভেজা ধান মিলিং করার সুবিধা হবে। স্বর্ণের দামের তুলনায় ধানের দাম পনেরো শ’ আঠারো শ’ করতে হবে। এই সহজ অর্থনীতিটি দেশের সরকার না বুঝলেও দেশের গরিব ধানকাটা শ্রমিক ঠিকই বুঝেছে। কেননা আগে ধানকেটে দশভাগে দেড়মণ ধান পেতো এখন ভাগে নয়, টাকায় নেয়- বাইশ শ’ চব্বিশ শ’ টাকা। ফলে তার একমণ ধানের দাম পড়ে দেড় হাজার, আঠারো শ’ টাকা। পঞ্চাশ হাজার, ঊনষাট হাজার টাকা স্বর্ণের দামেও তো ধানের দাম তাই হওয়া উচিৎ। চলুন আমাদের শ্রমিকের কাছে জীবনের, ক্ষুধার এ অঙ্কটা শিখে নিই। ধানের দামের সঙ্গে চাল ক্রেতা, চাল বিক্রেতা, মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ী দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকস্বার্থ, ক্ষেতমজুরস্বার্থ, সরকারের ও বাজারের স্থিতিশীলতা ইত্যাদি বিষয়গুলি জড়িত। যেহেতু সবচেয়ে নীচে আছেন ক্ষেতমজুর ও কৃষক এবং তারাই যেহেতু কঠোরতম পরিশ্রম করে ফসলটা ফলান সেহেতু তাদের প্রাপ্য লাভজনক দামের স্বার্থকে রক্ষা করে ধাপে ধাপে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়সংগত গ্রহণযোগ্য ‘জাতীয় কৃষি পণ্য দাম নীতি’ প্রণয়ন করতে হবে। বহুদেশে সকল অংশীদারদের (Stakeholders) নিয়ে এধরনের ‘স্থায়ী কৃষিপণ্য দাম কমিশন’ এবং ঐ নীতি কার্যকরী করার জন্য ‘বাজার সমবায়’ (ভোক্তা ও উৎপাদক উভয় স্তরে) ব্যবস্থা প্রচলিত আছে ও সুফলও দিচ্ছে। এই সব সৃজনশীল প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় সমাধানের জন্য কৃষক সমিতি ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে আজ আন্দোলন-সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে।
১৬ এপ্রিল ২০২১ ইং ২রা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ।