হাওরের গোপাট কৃষকের অভিশাপ

আসাদ মনি
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে বোরো ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ চলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ ধান কাটা শেষ হবে। হাওরের জাঙ্গাল (গোপাট) নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও ভোগান্তি কৃষকদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গোপাটের ভোগান্তির কারণে এবারও দুর্ভোগ পোহাতে হবে তাদের।
কৃষকরা বলছেন, প্রতিটি হাওরে কমবেশি গোপাট রয়েছে। এসব গোপাটে একাধিক জায়গায় ভাঙা থাকার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়াও সামান্য বৃষ্টি হলে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে যায় গোপাট। তখন ধান পরিবহনে বিকল্প ব্যবস্থার চিন্তা করতে হয়। তাই এই গোপাটগুলো আরসিসি পাকা সড়ক করে মূল সড়কে যুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন। যাতে সহজেই ক্ষেত থেকে ধান বাড়িতে পরিবহন করা যায়।
তাহিরপুর উপজেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সবুজ মিয়া। এবার শনির হাওরে দেড় হাল ( ৩৬০ শতাংশে ১ হাল) জমিতে ধান চাষ করেছেন। এই কৃষির উপরই নির্ভরশীল তিনি। তার চাষকৃত অনেক জমির ধান পেকে গেছে। এখন কেটে মাড়াই দিয়ে বাড়ি আনবেন ধান। তবে হাওরের গোপাটের বেহাল অবস্থা দেখে চিন্তিত তিনি।
সবুজ মিয়া বললেন, প্রতিবছরই শনির হাওরে ধান চাষ করি। ধান পাকার পর কেটে আনতে প্রতি বছরেই ভোগান্তির শিকার হই। এবারও তাই হচ্ছে। শনির হাওরের জাঙ্গাল অনেক অংশই ভাঙ্গা। এই ভাঙ্গার কারণে গাড়ি চলে না। আবার বৃষ্টির পর এসব জাঙ্গালে হেটে আসাই যায় না। তখন ক্ষেত থেকে ধান কেটে টেলা গাড়ি দিয়ে বাড়ির কাছে খলায় নিয়ে আসি। এতে কষ্ট যেমন হয় তেমনি অতিরিক্ত টাকাও খরচ করতে হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ইতিমধ্যে উৎসবের মধ্য দিয়ে হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটা। এবার বারো লক্ষ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এপর্যন্ত পুরো জেলায় ১৬ ভাগ ধান কাটা হয়েগেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পুরো জেলার ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সরকারি এই সংশ্লিষ্ট দপ্তরটি।
জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, আমি হালির হাওরে ১৪ (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) কেয়ার জমি ধান চাষ করেছি। ফলন ও ভালো হয়েছে। তবে জাঙ্গাল ভালো হলে হাওর থেকে ধান পরিবহন করতে আরও সুবিধা হবে। এখন টেলা গাড়ি দিয়ে ভেঙে ভেঙে ধান পরিবহন করতে হয়।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা অরুণ বৈদ্য অপু। জামখলা হাওরে ১৮ কেয়ার জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বললেন, আমাদের ধান এখনও পুরো পাকেনি। তবে আগামী এক সপ্তাহের ভেতর পেকে যাবে। প্রতি বছরই ক্ষেত থেকে ধান পরিবহন করতে ঝামেলায় পড়তে হয়। এবারও হবে। কারণ হাওরে ধান পরিবহনের জন্য কোনো রাস্তা নেই। আলাদা শ্রমিক দিয়ে ধান পরিবহন করতে হয়। অনেক মাথায়, কাঁদে করে ধান পরিবহন করে। এতে অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ নষ্ট হয়।
এদিকে হাওরের কৃষক সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকার গ্রামের রাস্তাঘাট নিয়ে যেরকম উদ্যোগ নেয়, এরকম হাওরের গোপাটগুলো নিয়ে তেমন ভাবে না। সব সময় হাওরের গোপাটগুলো থাকে অবহেলিত। এরফলে প্রতিবছরেই ধান কাটা, পরিবহন, মাড়াই, শুকানো থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটিতে কৃষকদের দুভোর্গ পোহাতে হয়।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু বলেন, আমরা সারা জীবন ধরেই দেখে আসছি কৃষকদের নিয়ে অবহেলা। সরকার একটিতে নজর দিলে আরেকটিতে দেয় না। তবু আগের থেকে অনেকটা সচেতন হয়েছে। হাওর রক্ষা বাঁধগুলোতে একটু নজরদারিতে রাখা হয় এখন। তবে কৃষকের ফসল রক্ষা করে দেয়ার পাশাপাশি ফসল যাতে ঘরে তুলতে পারে সে ব্যবস্থাও তো করে দেয়া প্রয়োজন। তাই আমরা দাবি জানাই, হাওর রক্ষা বাঁধের মতো হাওরের গোপাটগুলো পাকা করে দেয়া হোক। যাতে কৃষক তার আবাদকৃত ধান সহজেই বাড়িতে পরিবহন করে নিয়ে আসতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফরিদুল হাসান বলেন, হাওরের গোপাটগুলো ভালো হলে কৃষকদের ধান পরিবহনে সুবিধা হতো। এই কাজটি হলো এলজিইডির আওয়াতাভুক্ত। আমাদের কিছু করার নেই। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ মে’র মধ্যে ১০০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।