হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা/ উড়াল সড়কের সাথে জলপথকেও বিবেচনায় নিতে হবে

হাওর এলাকার পরিবেশ ও ভূমিপ্রকৃতি রক্ষার জন্য হাওরাঞ্চলে নতুন করে সড়ক নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। বিষয়টি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিষয়ক একটি বার্ষিক সম্মেলনে এই কথা পুনরুচ্চারণ করেন তিনি। হাওরের সড়ক ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে অকাল বন্যায় ব্যাপকভাবে ফসল হানি ঘটে। বিশেষ করে যে বছর উজানের পাহাড়ে অতিবৃষ্টি হয় সে বছর হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। গবেষকরা বলেছিলেন হাওরে কোনো সড়ক হতে হলে তার ৩০ ভাগ জায়গা সেতু বা কালভার্ট দিয়ে উন্মুক্ত রাখতে হবে যাতে পানির চলাচল স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু এখন হাওরে যেসব রাস্তা নির্মাণ করা হয় সেখানে আড়াই ভাগ জায়গাও এরূপ উন্মুক্ত রাখা হয় না। ফলে ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করে আর বেরোনোর জায়গা খোঁজে পায় না। ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ দেয়া হচ্ছে সেগুলোও হাওরের জলাবদ্ধতা তৈরি ও পানি নিষ্কাষণ না হওয়ার অন্যতম কারণ। হাওরকে ক্রমাগত নানাভাবে বেঁধে ফেলার কারণে হাওরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হচ্ছে এবং হাওর থেকে আমরা প্রাকৃতিকভাবে যে সম্পদ আহরণ করতে পারতাম তারও সংকোচন ঘটছে। বাংলাদেশের বিশাল হাওরাঞ্চল কৃষি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। হাওরের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বহু সুযোগ অবারিত। তাই হাওরের যাবতীয় ঝুঁকি হ্রাস করা অন্যতম জাতীয় দায়িত্ব হওয়া উচিৎ। ২০১৭ ও ২০২২ সনের ব্যাপক ফসল হানি হাওরের সমস্যাকে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। সরকার এমন বিবেচনা বোধ থেকেই হাওরে নতুন করে সড়ক নির্মাণ না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
হাওরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন উড়াল সড়কের মাধ্যমে করার ভাবনা নীতিনির্ধারকদের। কিশোরগঞ্জের হাওরে ইতোমধ্যে এমন উড়াল সড়ক নির্মাণ করার একটি বড় প্রকল্প খুব শীঘ্রই বাস্তবায়ন শুরু হবে। এজন্য প্রকল্প ব্যয় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা হতে পারে (সূত্র দৈনিক সমকাল ১৪ জানুয়ারি ২০২৩)। এমন উড়াল সড়ক সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে তৈরি করার সক্রিয় চিন্তাও রয়েছে সরকারের। হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ও হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় এসব উড়াল সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অত্যধিক ব্যয়ের কারণে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা দেশের সক্ষমতা বিবেচনায় কিছুটা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন হবে। বিশেষ করে বর্তমান সংকটজনক সময়ে তো নয়ই। সেজন্য হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে উড়াল সড়কের সাথে বিকল্প ভাবনাগুলোকেও প্রাধান্য দিতে হবে।
হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে জলপথ নির্ভর করার প্রচুর সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। হাওরাঞ্চল অসংখ্য ছোট-বড় নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া বর্ষার সময় পুরো হাওরাঞ্চল বিশাল জলপথে পরিণত হয়। তাই নদী ও হাওরের এই জলপথ সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর চিন্তা শুরু করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি। প্রয়োজন হবে নদীগুলোর খনন কাজ। এই খনন কাজের ফলে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পেয়ে জল ধারণ ক্ষমতা বাড়বে। যা হাওরগুলোকে অকাল বন্যার হাত থেকে রক্ষা করবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বন্যা-ঝুঁকি মোকাবিলা এই দ্বিবিধ উপকার পেতে নদীপথ নিয়ে চিন্তা করা হবে সবচাইতে উপযোগী। বাংলাদেশের মানুষ আবহমান কাল থেকে জলনির্ভর যোগাযোগে অভ্যস্ত। এমন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটালে মানুষ সহজেই তা মেনে নিবে। জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা সড়ক পথের চাইতে সব দিক দিয়ে সাশ্রয়ী। বন্যার ঝুঁকি কমানো গেলে হাওরের ফসলের নিরাপত্তাও বাড়বে। তাই পুঁজিবাদী চিন্তাপ্রসূত তথাকথিত সড়ক কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ভাবার জায়গা থেকে সরে আসা এখন দেশের স্বার্থেই দরকার।