হাবিব পাগলার ভাবসমুদ্রের ফুলটঙ্গি ঘর

ইকবাল কাগজী
‘হাবিব পাগলা আবার কে ? চিনি তো না !’
কিঞ্চিৎ বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে যে-কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ‘হাবিব পাগলা আবার কে ? চিনি তো না !’ কথায় বলে প্রচারে প্রসার। হাবিব পাগলার প্রচার নেই প্রসারও নেই। আসলেই তাঁর পরিচিতি এতোই কম যে, দেশে বিদেশে তো দূরের কথা, সুনামগঞ্জে তাঁর জন্ম, অথচ সুনামগঞ্জের মানুষের কাছেই তিনি নিতান্ত অপরিচিতজন। তাঁকে নিয়ে এবংবিধ প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে-কেউ করতে পারেন,এটাই স্বাভাবিক। যাঁরা লোকসংস্কৃতির চর্চা করেন কিংবা নিদেনপক্ষে লোকসাহিত্যের মালমসলা সংগ্রহ করেন তাঁরা তাঁর সন্ধান পান নি বা পেলেও তাঁকে প্রকাশবঞ্চনার আড়ালমুক্ত করতে প্রাণিত হন নি, কোনও না কোনও কারণে। লোকান্তরিত ও প্রকাশবঞ্চিত লোককবিদের সৃষ্টিসম্ভার রক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালিরা এখনও ভীষণ পিছিয়ে পড়াদের দলেই পড়ে আছে এবং অবলুপ্ত হচ্ছে জলসংস্কৃতিঋদ্ধ ঐতিহ্যসম্ভার কিংবা বাঙালির অতীতকথা এবং তৎসঙ্গে জাতিগত মানসসংস্কৃতির জ্যোতি, আত্মপরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল সূত্র, অবিমৃষ্যকর অযতœ-অবহেলায় ক্রমেক্রমে যেমন বিলুপ্ত হ”েচ্ছ টাঙ্গুয়ার হাওরের জীবচৈত্র্য, ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রতিবেশ। এই পশ্চাদপতার পদাঙ্ক অনুসরণের কলঙ্ক নিরসনে সচেষ্ট হতে হবে এখনই, এর কোনও বিকল্প নেই। যদিও বাংলা একাডেমির মতো যুগান্তকর ও আধুনিক প্রতিষ্ঠান আমাদের আছে। অযাচিত বিতর্কের উদ্রেক হতে পারে, তবু বলছি, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উদ্ধারের প্রশ্নে এটিকে যথাযথভাবে কার্যকর করে তোলা যায় নি। লোকসংস্কৃতির ক্ষয়াভিমুখী সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্টজনের সংস্কৃতিজ্ঞানসম্পন্ন উত্তরাধিকারীরা অনুপ্রাণিত হন বেশি, অন্যথায় তাঁদের লোকস্মৃতি ও তাঁদের সৃষ্টি উভয়ই কালের করাল কবলে পতিত হয়ে চিরতরে লোকান্তরিত হয়।
সিঁড়িঘরের গল্প : শ্রীশর্মার আবির্ভাব এবং …
হাজী মকবুল পুরকায়স্থ (এইচএমপি) উচ্চবিদ্যালয়ের দোতলার সিঁড়িঘরে তখন থাকি। সন-তারিখের ঠিকঠাক ঠিকুজি মনে নেই। সম্ভবত গতশতকের শেষ দশকের প্রথমার্ধের এক দিনদুপুরে, বলা নেই কওয়া নেই হুট করে, নন্দলাল শর্মা (সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে তিনি তখন শিক্ষক) এসে হাজির। আমি তো অবাক। কার কাছ থেকে খবর পেয়েছেন, কে যে তাঁকে বলে দিয়েছে, কে জানে। আমার কাছে রক্ষিত একটি হাতে লেখা খাতা, উল্টেপাল্টে দেখলেন এবং কীছু একটা টুকে নিয়ে চলে গেলেন। তাঁর বই ‘সুনামগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন’ আত্মপ্রকাশ করলে তাতে দেখলাম তিনি লিখেছেন, ‘সুনামগঞ্জের একজন বাউল কবি এবাদুর রহমান। তাঁর রচিত ৪২টি বাউল গানের একটি খাতা ইকবাল কাগজীর কাছে সংরক্ষিত আছে। তাঁর একটি গানের সূচনাÑ আমার মন মাঝি বেভুলা/ মনের মত মানুষ পাইলে অইও তার চেলা।’ (নন্দলাল শর্মা, সুনামগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন, জালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ সিলেট, ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ২০Ñ২১।) একেই বলে করমে কেরমে কীছু একটা হয়ে যাওয়া, লোকগীতি সংগ্রাহক হয়ে গেলাম একেবারে কাগজে কলমে, ছাপার অক্ষরে স্বীকৃতি মিলে গেলো, অথচ আমি স্বয়ং আদৌ তা নই।
শ্রীশর্মা কথিত এই ‘বাউল কবি এবাদুর রহমান’-এর পুত্রের নাম হাবিবুর রহমান (১০ জুলাই ১৯১৭Ñ ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৯১)। কিন্তু কম্পিউটারে কম্পোজ করা পা-ুলিপিতে তাঁর নামটি অধিকাংশ গানের ভরন্তায় (ভনিতায়) লখনছিরির (লক্ষণশ্রীর) গ্রামুরে উচ্চারণে ‘হবিব পাগলা’ রূপে কোনও কোনও ব্যতিক্রম ব্যতীত প্রায় ক্ষেত্রেই উৎকলিত হয়েছে। উদাহরণ দেওয়া যাক : ‘ঈশান কোণার মেঘ দেখিয়া ভয়েতে প্রাণ যায় উড়িয়া রে।/ হবিব পাগলা দেখে চাইয়া নাও যাবে মরিয়া রে ॥ (গান নংÑ ৭৯) অথবা ‘হবিব পাগলা বলে, পাব কোন ছলে, কোন দেশে গেলে দেখা পাই তোমার।/ আগে দিয়া আশা, করিলে নৈরাশা, ঘটল দুর্দশা আমি অভাগার ॥’ (গান নংÑ ৭)। আঞ্চলিক উচ্চারণ অনুসরণ করে কিংবা লোকনিরুক্তিকে মান্যতা দিয়ে তাঁর নামের আকার (া) বর্জনে কোনও বিদগ্ধতার মহত্ব নেই এবং ‘হাবিব’ ‘হবিব’ হয়ে গেলে তাতে যে-উচ্চারণবিকৃতি সংঘটিত হয় সেটা ভাষিক সঙ্গতিকে বিপর্যস্ত করে। তদুপরি জানা নেই যে, ‘হবিব’ উচ্চারণের প্রতি স্বয়ং কবির অনুরক্তি ছিল কি না। সুতরাং বিদগ্ধ বুদ্ধির নিরিখে এই বিকৃতি মান্যতা পাওয়ার কোনও যোগ্যতা ধারণ করে না। ‘হাবিব’ মূলতই (আরবি উচ্চারণে) ‘হাবিব’ এটিকে বিকৃত না করাই অধিক বিবেচনাসম্মত।
সাধনসিদ্ধির নিগুমত্ব ও চিরন্তন ভাবপ্রক্ষিপ্ততা
বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের বিশাল বিস্তৃতে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জের, গ্রামসামাজিক পরিসরের আনাচে কানাচে অতীতে যেমন ছিল এবং বর্তমানেও তেমন অব্যাহত আছে অসংখ্য বাউলদের রচনায় চিরন্তন বাউলত্বের ঘরনার চর্চা। এই নিরিখে হাবিব পাগলা বিশেষ ব্যতিক্রম কেউ নন, তিনি সেই বাউল গান রচয়িতাদেরই একজন, যাঁরা গণনায় অসংখ্য। সর্বজনবিদিত একটি ব্যাপার এই যে, সুনামগঞ্জে এবংবিধ বাউলত্বের চর্চা জায়মান আছে শিষ্য-প্রশিষ্য পর্যায়ে কালনিরবধি। কারও কারও রচনা পুস্তকাকারে জনজসমাজে আবির্ভূত হয় আবার কারও কারও রচনা অযতœ অবহেলায় কালের করাল গ্রাসে চিরতরে হারিয়ে যায়। যাঁরা গান সংগ্রহ করেন তাঁদের প্রচেষ্টার মধ্যে প্রক্ষিপ্ততার (একজনের গান অন্য জনের নামে প্রচার-প্রচলিত হওয়া) বিষয়টি থেকে যায় কোনও কোনও সংগ্রাহকের অজান্তেই। হাবিব পাগলার ক্ষেত্রে এই গানপ্রক্ষিপ্ততার বিষয়টি, নির্বিঘেœ বলা যায়, নেই। কারণ এই গানের সংগ্রাহক কবিপুত্র (লতিফুর রহমান রাজু) স্বয়ং, তিনি সেটা সংগ্রহ করেছেন তাঁর পারিবারিক দস্তাবেজ থেকে। এখানে গানপ্রক্ষিপ্ততার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা, অবস্থা পরিপ্রেক্ষিতে, নেই বলেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
বলছিলাম ‘অসংখ্য বাউলদের রচনায় চিরন্তন বাউলত্বের ঘরনার চর্চা’র কথা। প্রসঙ্গটি নিয়ে কিঞ্চিৎ ভাবনা মনের ভেতরে তোলপাড় করছে, ভাবনা করছি। চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণের নিরিখে, অর্থাৎ প্রাজ্ঞপ-িত নির্ধারিত ‘বাউলের সংজ্ঞা’ অনুসারে, বলতে গেলে কেউই হয় তো বাউল নন, আশেপাশে বাউলত্ব যাঁরা দেখান, ব্যতিক্রমী দুয়েকজন ছাড়া। লালন সাঁইকে যেভাবে নির্দ্বিধায় চোখবুজে বাউল বলা যায়, শাহ আব্দুল করিমকে তেমনটি নয়, যদিও তাঁকে (শাহ আব্দুল করিমকে) তাঁর অত্যোৎসাহী ভক্তবৃন্দকর্তৃক ‘বাউল স¤্রাট’ আখ্যা দেওয়া হয়ে গেছে, তাঁর জীবিতাবস্থায়ই। কিন্তু বিদগ্ধমহলে শাহ আব্দুল করিমের বাউলত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বাউল কি না সে-নিয়ে লেখালেখিও হয়েছে যৎকিঞ্চিৎ। কেউ কেউ তাঁকে বাউল বলে স্বীকার করতে চান না বটে, কিন্তু তাঁর গানকে নিশ্চিতভাবেই বাউল ঘরানার বা বাউল আঙ্গিকের বলে স্বীকার করেন। হাবিব পাগলাকেও এই নিরিখে বিচার যে-কেউ করতেই পারেন এবং তাঁর গানের বিষয়বস্তুতে বিদগ্ধজনের বিবেচক দৃষ্টিতে বাউলত্ব কিংবা বাউল আঙ্গিকতা পরিলক্ষিত হবে ষোলআনার অধিক সতেরো আনা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। প্রাতিস্বিক পর্যায়ে হাবিব পাগলা বাউল ছিলেন কি না সে বিষয়প্রপঞ্চটি নিয়ে এখানে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে চাই না এবং তা আমার পক্ষে সম্ভবও নয়, কারণ সে-বিষয়ে আমি প্রাজ্ঞ তো নইই, বরং বলা যায় একেবারেই মূর্খ, যাকে বলে ক-অক্ষরগোমাংস।
হাবিব পাগলার গানে প্রক্ষিপ্ততা না থাক কিন্তু তাঁর গানের আঙ্গিক ও ভাবনায় কিংবা রচনার ধাঁচ ও ভাববিভঙ্গ প্রকাশে এবং ভাবাদর্শ ও দার্শনিকতায় প্রক্ষিপ্ততা বিদ্যমান, যা তাঁর মতো প্রায় সকল লোককবিদের বা বাউল গান রচয়িতাদের মধ্যে সংগুপ্ত বা প্রচ্ছন্ন থাকে এবং লোককবিদের এই সাধারণ স্বাভাবিক উত্তরাধিকার প্রমাণ করে যে, সুনামগঞ্জ অনাদিকাল থেকে মরমিয়াসংস্কৃতি চর্চার এক সমৃদ্ধ আধেয়, এতে আজ অবধি কখনও কোনও ব্যতিক্রম ঘটে নি। এই নিরিখে সশ্রদ্ধচিত্তে এবং আনন্দের সঙ্গেই স্বীকার করে নেওয়া যায় যে, অবশ্যই ভাবাদর্শিক কিংবা দার্শনিক প্রক্ষিপ্ততা আছে হাবিব পাগলার অনুসৃত আত্মতত্ত্বের দার্শনিকতায় এবং এই প্রক্ষিপ্ততা তাঁর কবিত্বের এক গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার। এই অধিকার তিনি পেয়েছেন তাঁর দূর-অদূর পূর্বসূরির থেকেÑ লালন, রাধারমণ, হাসনের থেকেÑ তাঁর গানের উপজীব্য বিষয়বস্তুতে তা সুস্পষ্ট এবং যে-কোনও সচেতন ও বিদগ্ধ পাঠকশ্রোতার কাছেও অনায়াসে উপলভ্য। এই সম্পর্কে আহমদ শরীফের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘আত্মা পরমাত্মার অংশ। কাজেই আত্মাকে জানলেই পরমাত্মাকে জানা হয়। তাই দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানাই বাউলব্রত। (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৪৭) এই অভিমত স্বীকার করে নিলে, এই সিদ্ধান্তে সহজেই উপনীত হওয়া যায় যে, হাবিব পাগলা তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে ব্যতিক্রমী কেউ নন, যেমন ব্যতিক্রমী সাম্যবাদী চেতনায় প্রদীপ্ত শাহ আব্দুল করিম। হাবিব পাগলা তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই স্বাভাবিক সমাজবাস্তবতার মাটির রসে সিক্ত হয়ে মরমিয়া ভাবাদর্শে সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন, মরমিয়া চিন্তা তাঁর প্রাণে হিল্লোল তোলেছিল, তাঁর বাড়ির পাশে প্রমত্ত সুরমার কল্লোলের মতোই নিরন্তর। তাঁর গানের চরণে চরণে সে-সঞ্জীবনের প্রভুত প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়। তিনি যে-বাড়ির বসয়ী ছিলেন বা জীবন কাটিয়েছেন যে-বাড়িতে তার পাশের বাড়িটি তাঁর বাউলপূর্বসূরি হাসন রাজার (১৮৫৪Ñ১৯২২), যিনি বৈবাহিকসূত্রে তাঁর ঘনিষ্ট আত্মীয় ছিলেন। এই আত্মীয়তার সূত্রসন্ধান করতে গিয়ে কেউ লিখে ফেলতে পারেন অতি সহজেই, ‘তাঁর পিতা আলহাজ্ব এবাদুর রহমান মাতা মজমুন নেছা। দাদা জাবিদ বক্স। মো. হাববিুর রহমান (হাবিব পাগলা)’র দাদা জাবিদ বক্স মরমী কবি হাসন রাজার বেয়াই ছিলেন। বৈবাহিক সূত্রে হাবিব পাগলার ফুফাতো ভাই হলেন আনোয়ার রাজা আর আনোয়ার রাজার মামতো ভাই হাবিব পাগলা।’
হাসন রাজার মরমিয়া গানের খ্যাতি বিশ্বজুড়া। সহজিয়া ভাবের মহাজন এই পূর্বসূরির গানের আত্মতত্ত্বের উত্তরাধিকার হাবিব পাগলা ঠিকই পেয়েছিলেন, যদিও তাঁর জন্মের (১৯১৭) চার/পাঁচ বছর অতিবাহিতের পরই হাসন রাজা লোকান্তরিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ হাসন রাজার সঙ্গে হাবিব পাগলার মরমিয়া ভাববিনিময়ের প্রত্যক্ষ ও জাগতিক কোনও সংযোগ সম্ভব হয়ে উঠে নি, কিন্তু তাই বলে দু’জনের মধ্যে কালনিরপেক্ষ মরমিয়া বাউলত্বের সম্পর্কটা আসলেই অস্বীকার করতে পারবেন না তাঁর উত্তরপ্রজন্মের গানপাগল মানুষেরা কিংবা যাঁরাই তাঁর গানের মর্মানুসন্ধানে ব্যাপৃত হবেন তাঁরা। তাঁর (হাবিব পাগলার) উত্তরপ্রজন্মের লোকসঙ্গীতচর্চায় নিরতজনেরা কিংবা লোকসঙ্গীত গবেষকগণ তাঁর গানের ভাবসাগরের হিল্লোলে হাসন রাজার গানের ভাবসাগরের কল্লোল শ্রবণে সম্মোহিত ও বিমুগ্ধ হবেন। যে-কোনও বাউলব্রতীর ক্ষেত্রে এমনটি হওয়াই সঙ্গত-স্বাভাবিকই, এর কোনও ব্যতিক্রম হতে পারে না। কারণ বাউলবিদ্যা পুরোটাই গুরুমুখী, গুরুশিষ্যের সম্মিলনেই কেবল এর চর্চা বর্ধিত হয়, পুষ্টি পায় এবং ভাবচিন্তার পারস্পরিক প্রক্ষিপ্ততার পরিসর তেরি হয়। বাংলাদেশের বাউল গানের রচয়িতাদের এরকম পারস্পরিক যোগ-সম্পর্ক-সঞ্চার-সংক্রামক ভাব-অনুভা-প্রভাব ইত্যাদি স্থানকালপাত্র নিরপেক্ষাবস্থায় জায়মান ছিল-আছে-থাকবে এবং কে যে কার প্রভাব থেকে মুক্ত কিংবা বিমুক্ত তার কোনও হদিস করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কুষ্ঠিয়ার লালনের সঙ্গে সুনামগঞ্জের হাসন রাজার কোনও প্রত্যক্ষ সংযোগ-জগতিকতা নেই কিন্তু পরোক্ষ মরমিয়তা যথার্থই নিহিত আছে তাঁদের গানের বাউলত্বের অন্তরিক্ষে, আসলে বাঊলব্রত ধারণে তাঁরা এক, সমকালীন না হয়েও। দু’জেনের অন্তরে সাক্ষাতের আকুলতা থাকা সত্ত্বেও রাধারমণ (১৮৩৪Ñ ১৯১৫) ও হাসনের (১৮৫৪Ñ১৯২২) ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচে নি তাঁদের যাপিত জীবনে এবং ধর্মের দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান তাঁদের মধ্যে ছিল, কিন্তু তাঁদের অন্তরে উপলব্ধ মরমিয়া ভাবতরঙ্গের জোয়ারে তাঁরা দু’জন একই নৌকার ঘনিষ্ঠ সহচর, তিরপিনী (ত্রিবেণী) পার হওয়ার সঙ্কল্প নিয়ে ঘাট হতে তাঁরা যে-নৌকায় চড়ে বসেছেন প্রতীকী দ্যোতনায় সেটা একটাইÑ ঘাটপারের (কামনদী পারের) খেয়া। কালনিরপেক্ষ এই ঘাটপারের (বাউলরা ‘পারঘাটা’ও বলেন ) খেয়ার যাত্রী হাবিব পাগলাও। এইখানে লালন, রাধারমণ, হাসন কিংবা হাবিব প্রতীকী অর্থে সকলেই একই নৌকার সোয়ারী, তাঁদের জাগতিক অস্তিত্বের ফাঁরাফাৎ (ফাঁরাক+তফাৎ) যতোই থাকুক। তাঁরা সকলেই স্থানকালপাত্র নিরপেক্ষ সতীর্থ।
জলশ্যামল-সুন্দর-সহজিয়া সুনামগঞ্জের উদাস করা উদার প্রকৃতি হাবিব পাগলাকে হাসন রাজার কিংবা মরমিয়া পূর্বসূরিদের ভাবাদর্শিক উত্তরসূরি করে তোলেছিল ঠিকই, তাতে কোনও অন্যথা হয় নি। মানুষের মনে এই আত্মতত্ত্বের জাগরণের প্রতিবেশ নিয়ে আলোচনা করেছেন একজন। তিনি বলেছেন, ‘[…] আদিগন্ত প্রসারিত জল, তার সোঁদা গন্ধ, অন্তঃশায়ী মীন, ঢেউয়ের লহর আর সেই সলিল সন্নিধ্যের উর্ধ্বস্তরে সূর্য-চাঁদ-তমসা-আলোর বিকিরণÑ মানুষকে ভাবুক করে তোলে। নিছক দিনযাপনের প্রত্যক্ষতা ছাপিয়ে উদ্ভাস জাগে প্রচ্ছন্ন রহস্যময় অন্তর্গূঢ় মানসতার। তখন মানুষ গান রচে, গান গায়, গান শোনেÑ আর সেই গানের মধ্যে ছায়াসঞ্চার করে জীবনবীজ, তার ফলপরিনাম ও অন্তর্রুদ্ধ আর্তি।’ (সুধীর চক্রবর্তী, জালাল গীতি : ‘কত রঙ্গের নক্শি কাঁথা’, নিরন্তর : ষষ্ঠ সংখ্যা শীত সঙ্কলন, পৌষ ১৪১২, সম্পাদক : নাঈম হাসান, পৃষ্ঠা : ০২)। শ্রীচক্রবর্তীর এই সবিশেষ প্রাণিধানিক বয়ার্ণনাটি (বয়ান+বর্ণনা+টি) প্রযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের কিংবদন্তি বাউল-গীতিকার জালাল উদ্দিন খাঁর কবি হয়ে উঠতে সহায়ক কিংবা স্বাভাবিকভাবেই উজ্জীবক-উদ্দীপকের ভূমিকায় পর্যবসিত হওয়া জন্মভুমির প্রতিবেশের রূপবৈচিত্র্যের মহিমা প্রকাশের অনুরোধে। সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর তীরে বৃক্ষলতা পরিবেষ্টিত সবুজ গ্রাম লখনছিরির জলসহজ কিংবা জলমরমিয়া প্রাতিবেশিক রূপবৈচিত্র্য জালাল উদ্দীন খাঁর মতোই হাবিব পাগলার অন্তরেও সৃষ্টি করেছে এক অপরূপ ‘অন্তর্রুদ্ধ আর্তি’, যে-আর্তি মানুষকে মরমিয়া করে তোলে ভেতরে ভেতরে, প্রাণিত করে ‘বাউলব্রতী’ হতে এবং গান রচনায় উদ্দীপ্ত করে নিরন্তর । এই যে অন্তর্রুদ্ধ আর্তি, সে-আর্তির সংক্রমণ হতে রক্ষা পান না হাবিব পাগলার মতো তাঁর পূর্বসূরি রাধারমণ দত্ত, হাসন রাজা প্রমুখ কেউই। তাঁদের প্রত্যেকের অন্তরেও অন্তঃশায়ী ছিল সেই এক ‘প্রচ্ছন্ন রহস্যময় অন্তর্গূঢ় মানসতা’ এবং তাঁদেরকে বানিয়েছিল আউল, বাউল, বাতুল কিংবা পাগলÑ অন্তরের অসীম অন্তরিক্ষে আত্মলীন হওয়া সহজিয়া-মরমিয়া। তাই রাধারমণের উচ্চারণ ছিল, ‘অনিত্যকে নিত্য দেহে যখন দেখিবে/ গুরুর শুদ্ধমতি তখন জানিবে।’ (রাধারমণ গীতিমালা, সংগ্রহ ও সম্পাদনা : নন্দলাল শর্মা, বাংলা একাডেমি ঢাকা, জুন ২০০২, পৃষ্ঠা : ১১)। আর হাসনের উচ্চারণ ছিল, ‘বাহিরে ভিতরে বন্ধু আমার কাছে/ বন্ধু কোলে লইয়া এখন হাসন রাজায় নাচে ॥’ (হাসন রাজা সংগীতসমগ্র, সম্পাদনা : সামারীন দেওয়ান, মাওলা ব্রাদার্স ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৫৩)। অন্তর্গূঢ় মানসতায় উজ্জীবিত এই আত্মতত্ত্বের দার্র্শনিকতা (দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানা) থেকে তাঁরা দু’জনের কেউই বিযুক্ত ছিলেন না, বরং ছিলেন আত্মতত্ত্বে দড় দার্শনিক, যাকে বলে মরমিয়া কিংবা মারফতিতত্ত্বে সিদ্ধপুরুষÑএকজন বৈষ্ণব, তো অন্যজন বাউল অথবা সুফি। হাসন রাজা যাকে ‘বন্ধু’ বলেন, যাকে কোলে তোলে ফানাফিল্লাবস্থায় (রাধারমণের ক্ষেত্রে ‘সামরস্য’) নাচেন, তাঁর প্রকৃষ্ট পরম প্রকাশ হাসন রাজার গানে পাই ‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে আপনার রূপ দেখিলাম রে ॥/ আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে,/ দেখা দিয়া প্রাণ লইয়া সামাইল ভিতরে,/ আদম ছুরত দিল দেখা ধরিয়া আমারে ॥’ (হাসন রাজা সংগীতসমগ্র, সম্পাদনা : সামারীন দেওয়ান, মাওলা ব্রাদার্স ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ১০৬।) হাবিব পাগলা এই ফানাফিল্লাবস্থার কিংবা সামরস্যের উপলব্ধি থেকে বঞ্চিত ছিলেন না, বলা যায়, তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন এবং তিনি নিজের একটি আলাদা কাব্যিক জগত, ভাবসমুদ্র, তৈরি করেছিলেন । সে-সমুদ্রের বুকে ‘অধর’কে নিয়ে বসবাসের তার একটি ফুলটঙ্গি ঘর ছিল। সাধনসিদ্ধ হাবিব পাগলা বলেন, ‘মনের মানুষ আছে মনে, ধরতে যদি পার জ্ঞানে,/ আছে সে তোমার সামনে ওরে আমার মন পাগল।/ মনের মানুষ মনে ঘুরে, থাকে না কখনও বাহিরে,/ ধর তারে নামের জোরে, লাগাও পায়ে প্রেম শিকল ॥’ (গান নংÑ ২৪)। অথবা ‘থাকে আদম শহরে, ইচ্ছামত ঘুরে ফিরে,/ জ্ঞানাঙ্কুশে ধর তারে নইলে সে দিবে উড়া।/ জ্ঞানচক্ষুতে দেখ চাইয়া, নিকটেতে আছে বইয়া,/ কী হবে সংসার ছাড়িয়া সে তো নয় তোমা ছাড়া ॥ (গান নংÑ২২)। গৃহী বাউল-সুফির এই বোধ উপলব্ধিই বৈষ্ণবের সামরস্য এবং বিপরীতে বাউল-সুফির ‘ফানাফিল্লা’ (আল্লাহর কাছে সমর্পিত) বলে অভিহিত, সে-এক অন্যরকম আনন্দলোকÑ অনবদ্য অমৃতপুর, সাধারণের অনুপলভ্য।
সক্রেটিস এবং সামরস্য কিংবা ফানাফিল্লার নিগুমার্থ সংশ্লিষ্ট আহমদ শরীফের ‘শব্দার্থ ও টীকা’
মরমিয়া বাউলত্বের ভাবপ্রপঞ্চটি হৃদয়ঙ্গম করার অনুরোধে এখানে ‘সামরস্য’ বলতে কী বোঝায় তার একটু ঠিকুজিসন্ধান প্রয়োজন। আহমদ শরীফ লিখেছেন, “[…] মূলাধার থেকে তাই শুক্রকে নাড়ীর মাধ্যমে উর্ধ্বে উত্তোলন করে ললাট দেশে সঞ্চিত করে রাখলেই ইচ্ছাশক্তির পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব। এটিই সামরস্য, সহজাবস্থা, চিররমণানন্দাবস্থা বা সচ্চিদানন্দাবস্থাÑ শিব-শক্তি, প্রজ্ঞা-উপায় বা রাধা-কৃষ্ণের অন্বয় সংস্থিতি। এটিই সিদ্ধি।” (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৪২।) জগতে এই ‘সিদ্ধি’ (দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানার সাধনায় পূর্ণতাপ্রাপ্তি) অর্জনের প্রচেষ্টাবহির্ভূত কোনও বাউলব্রতী নেই। বাংলাভাষায় রচিত বাউল গানের পঙক্তিতে পঙক্তিতে বাউলের সে-প্রচেষ্টাব্যাকুলতার প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। তাঁদের গানের পরতে পরতে, চরণে চরণে এই ‘সিদ্ধি’ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শব্দের ঠাসাঠাসি সন্নিবেশ দুর্লক্ষ্য নয়। বাউল গান রচয়িতাদের মধ্যে এই প্রয়াসপ্রাঞ্চিকতা প্রাতিস্বিক তো নয়ই বরং তা বাউলদের তত্ত্বপ্রকাশে সহায়ক সার্বজনীন সম্পদ। কেননা বাউল গীতিকাররা ধর্মবর্ণশ্রেণিঘরানা নির্বিশেষে শিষ্য-প্রশিষ্য সকলেই গানের বণীরূপায়ণে যে-সব শব্দ ব্যবহার করেছেন বা করেন, সে-সব শব্দের অর্থদ্যোতনায় কোনও সমীম প্রাতিস্বিকতার লেশমাত্র নেই আছে সর্বজনীনতার অপার অসীমতা।
সুসংবদ্ধ ও প্রকৃষ্ট বাউল গানের চরণে চরণে সন্নিবেশিত মানুষ, অচিন মানুষ, মনের মানুষ, মনুরা, মনুরায়, পাখি, অধর, আদম ছুরত, আলেখ, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, আট কুঠুরি নয় দরোজা, আঠারো মোকাম, আয়না মহল, বারামখানা, বাসাবাড়ি, লাহুত, জবরুত, ষোলজন বোস্বেটে, ছয়জন, ছয় ডাকাইত, মনপবন, মনমাঝি, অমৃত, সুধা, বিষ, গরল, কামরূপ, মূলাধার, কুল-কু-লিনী, মণিপুর, গঙ্গা, যমুনা, তিরপিনী, ত্রিবেণী, নয়দ্বার, ঘাট, পারঘাটা, পদ্ম, দল, চক্র, ষটচক্র, আজ্ঞাচক্র, লতিফা, হৃদপদ্ম, দশম দল, চতুর্দল, ফুল, ফুলটঙ্গি, মদন, মঞ্জরী, সহ¯্রা, পুলছিরাত, বর্জক, ইল্লিন, সিজ্জিন, আতশপুরী, বাকা, বাকাবিল্লা, ফানা, ফানাফিল্লা, আনাল হক, পুরুষ, প্রকৃতি, ফকিরি, চন্দ্র, চাঁদ, ক্ষীর, বীজ, বিন্দু, লিঙ্গ, শম্ভূলিঙ্গ, বায়ু, দম, কুম্ভক, ভা-, তন, ঘর, পিঞ্জর, খাঁচা, জোয়ার, ভাটা, উজান, তালা, মন্ত্র, মধু, গুরুমন্ত্র, জাহের, বাতিন, দিদার, জিয়ন্তে মরা, নফস ইত্যাদি ইত্যাদি শব্দ, শব্দযূথ বা শব্দবন্ধ অধিক পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। এই সব শব্দ বা শব্দযূথের প্রত্যেকটি কোনও একটি বিশেষ ও নির্দিষ্ট অর্থদ্যোতকতা ধারণ করে প্রকৃতপ্রস্তাবে মরমিয়া সাধনসিদ্ধির বিশেষ বিষয়প্রকরণের পারিভাষিক শব্দপদমর্যাদা অর্জন করেছে । বাউলগান রচয়িতাদের সকলেই সে-বিষয়ে সবিশেষ পরিজ্ঞাত থাকেন, অন্যথায় তাঁদের পক্ষে মরমিয়া আত্মতত্ত্বের গূঢ় দার্শনিক প্রসঙ্গপ্রপঞ্চকে প্রকাশ করা কীছুতেই সম্ভব হয় না বা তাঁরা বউলব্রতী হতে পারেন না। হাবিব পাগলার গানেও এবংবিধ শব্দ বা শব্দযূথ দুর্লক্ষ্য নয়। তাঁর গানের চরণে চরণে তার প্রমাণ বিধৃত আছে। পর্যাপ্ত উদাহরণ উপস্থাপন করা সম্ভব। লেখার বপুত্ববহর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সে-বিশদ প্রচেষ্টা থেকে বিরত রইলাম। কেবল একটি গানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার প্রয়াশ পাব যে, হাবিব পাগলাও তাঁর তত্ত্বমূলক গানে এইসব শব্দ ব্যবহারে পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পারঙ্গম) ছিলেন এবং প্রকারান্তরে প্রমাণ করেছেন তিনি আত্মতত্ত্বের দার্শনিকতা কিংবা ‘দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানাই বাউলব্রত’র সাধনায় নিমজ্জনের পরিসরে জায়মান ও স্বাভাবিক তাত্ত্বিক প্রক্ষিপ্ততা থেকে বিযুক্ত কেউ নন এবং অনন্তর স্বীকার করে নিতে হয় যে বাউলতত্ত্বের বিকাশের ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক প্রক্ষিপ্ততা লালন থেকে হাবিব পাগলা কিংবা তারও পরের বাউলগান রচয়িতাদের অবিসংবাদিত উত্তরাধিকার।
হাবিব পাগলার গানে বাঊলতত্ত্বের গূঢ়ার্থদ্যোতক পারিভাষিক শব্দ, শব্দযূথের উদাহরণ হাজির করার পূর্বে তৎসংশিলষ্ট প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়প্রপঞ্চ নিয়ে কিঞ্চিৎ বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা) করে নেওয়া বোধ করি সমীচীন হবে। প্রসঙ্গটি তিরপিনী প্রপঞ্চ নিয়ে। বাউলকে তিরপিনীর ঘাট পেরুনোর প্রচেষ্টায় যাপিতজীবনের কাল কাটাতে হয়। বাউলের এই যাপিত জীবনের চর্চাটি (দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানার নিরন্তর সাধনা) কোনও সাধারণ জীবনাচরণ নয়, এটির একটি আলাদা বৈচিত্র্য ও গূঢ়ার্থ আছে। সে-‘আলাদা বৈচিত্র্য ও গূঢ়ার্থ’র দীর্ঘ বর্ণনা আপাতত পরিহার করছি। কেবল আহমদ শরীফের একটি প্রাসঙ্গিক উক্তি এখানে উদ্ধৃত করছি, বিষয়প্রপঞ্চটিকে যথাসম্ভব বোধগম্য করে তোলার প্রচেষ্টা স্বরূপ। তিনি বলেছেন, ‘[…] মুসলমান বাউলদের মধ্যে পরকীয়া ও মৈথুনাত্মক সাধনা দুর্লক্ষ্য; তারা যৌগিক প্রক্রিয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকেই প্রাধান্য দেয়।’ (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৩৯)। শ্রীশরীফের মতানুসারে এই হলো মুসলিম বাউলদের চর্চিত বাউল সাধনার সারাৎসার কিংবা আত্মতত্ত্বের দার্শনিকতা। অর্থাৎ স্থানকালপাত্রের পরিসরের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবে হাসন রাজা কিংবা হাবিব পাগলার মতোই রাধারমণ দত্ত, এলাহী বক্স, দৈখুরা, ভেলা শাহ, শীতালং, সৈয়দ শাহ নূর, কালা শাহ, দূর্বীণ শাহ কিংবা লালন শাহ প্রমুখেরা কেউই এই আত্মতত্ত্বের দার্র্শনিকতার বৃহৎ বলয়ের বাইরের বাসিন্দা ছিলেন না, বরং ছিলেন ওতপ্রোত। বাউল গানের চর্চায় যে-কারও ক্ষেত্রে এবংবিধ আত্মতত্ত্বস্পৃষ্ট পারস্পরিক দার্শনিক প্রক্ষিপ্ততা স্বাভাবিক বটে এবং এতোটাই স্বাভাবিক যে, একটু সুক্ষ্ম বিবেচনায় এই স্বাভাবিকতার সূত্রমূল সক্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে ‘আত্মতত্ত্ব’-এর তাত্ত্বিক সম্পৃক্ততা সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ তত্ত্বের সঙ্গে একান্ত ওতপ্রোত । বাউলদের মধ্যে নিজেকে জানার এবংবিধ তাগিদ কিংবা এই আত্মতত্ত্বচর্চার সম্পর্কে আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘জীবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার স্থিতি। কাজেই আপন আত্মার পরিশুদ্ধিই খোদাপ্রাপ্তির উপায়। তাই আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির সাধনাই এদের প্রাথমিক ব্রত। এদের আদর্শ হচ্ছে : শহড়বিঃয ঃযুংবষভ; আত্মানং বিদ্ধি’Ñ ‘[…] নিজেকে চেন। কোরআনের কথায় ‘মান আরফা নাফসাহু ফাকাদ আরফা রাব্বাহু’Ñ ‘যে নিজেকে চিনেছে, সে আল্লাহকে চিনেছে।’ জীবনের পরম ও চরম সাধনা সে-খোদাকে চেনা।’ (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৪৬।) সুতরাং বিশ্বব্জুড়া মানুষের অন্তরাত্মায় বিলোড়িত সেই একই ‘অন্তর্রুদ্ধ আর্তি’র হিল্লোল কল্লোলিত হয়ে চলেছে নিরন্তর। স্থানকালপাত্রভেদের পরিপেক্ষিতে মানুষের মানসতার এই একটি এবং ঐকান্তিক ভাবক্রিয়ার বৈচিত্র্যের প্রপঞ্চপ্রসঙ্গের অবতারণা করে অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘পথের পার্থক্য, মতের অনৈক্য এবং সাধন পদ্ধতির বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাউল, বৈষ্ণব ও সুফীদের মধ্যে উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও পরিমাণগত মিল বর্তমান। তাই একের বাণীতে অপরের মনের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এক চরমক্ষণে দেহাধারস্থিত আত্মায় পরমাত্মার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তখন পরমকে উপলব্ধির আনন্দে সবাই একই সুরে বলে ‘আনল হক’ কিংবা ‘সোহম’। এই অদ্বৈতসিদ্ধি আমরা বাউলে-বৈষ্ণবে ও সুফিতে প্রত্যক্ষ করি। রাগাত্মিকা ভক্তিতে শুনি ‘মুই সেই’ সুফীরাও বলেন ‘আনল হক’, বাউলও বলেন, ‘দেহের মাঝে আছে রে সোনার মানুষ, ডাকলে কথা কয়’।’ (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৫০)। এই যে ‘একের বাণীতে অপরের মনের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়’ হাবিব পাগলার গান এই চিরন্তন ঐতিহ্যের মহিমাকে ধারণ করেই মরমিয়া বাউলত্বকেÑ দার্শনিকতার মাধুর্য মিশিয়ে যাকে বলা যায়, ‘আত্মতত্ত্বের দার্র্শনিকতা’Ñ প্রকারান্তরে প্রোজ্জ্বল করে তোলে।
‘আত্মতত্ত্বের দার্র্শনিকতা’ এই শব্দদ্বৈতের নির্গলিতার্থ থেকে এই প্রতীতি হতে পারে যে, বাউল কবিদের গানের আদি-অন্তে বিস্তৃত ‘আত্মতত্ত্ব’-এর ভাবপ্রপঞ্চটি তাঁদের অন্তরে উজ্জীবিত হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রবণতা কিংবা এটি বাউলদের স্বভাব মানসতা। অনেকটা তাই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই স্বাভাবিক আত্মতত্ত্বগ্রস্ততার সংক্রমণ থেকে হাবিব পাগলা কোনওক্রমেই বিযুক্ত নন, বরং সার্বিক বিচেনায় অধিক মাত্রায় নিমগ্ন ও নিমজ্জিত। তাঁর গানে তিনি তার যথার্থ প্রমাণ রেখেছেন। সাধন প্রকরণের পর্যায়ক্রমিক সাফল্যের সোপান ডিঙিয়ে সামরস্যে বা ফানাফিল্লায় উত্তরণের যে যোগপ্রায়োগিক ক্রিয়া মরমিয়া সাধকরা অভ্যাস করেন সিদ্ধি লাভের বাসনায়, তার কাব্যবয়ার্ণনা (কাব্য+বয়ান+বর্ণনা) পরিলক্ষিত হয় তাঁর গানের বন্ধনে। কম্পিউটারে কম্পোজকৃত ২৩৬ নং গানে তিনি যখন বলেন : ‘বন্ধে কেনে করিল ছলনা, দুঃখ গেল না।/ পানির পাল টাঙ্গাইয়া কামনদীতে ঢেউ তুলিয়া/ ত্রিবেণী পার করল আমায় কি না ॥ দুঃখ গেল না …/ আমারে ফাঁকি দিয়া, পরদা ব্যবধান রাখিয়া, আমার ঘরে করে আনাযানা।/ বিদেশি নাগর সে, কেউ না তাহার খবর রাখে, আমার ঘরে করছে বৈঠকখানা ॥/ নিকেট সে দূরে নয়, ফুলের মধু লুঠিয়া লয়, (আমার) আঁচল ধরে করে টানাটানি।/ চতুর্দল আধারেতে, শম্ভূ লিঙ্গ মূলেতে, বানছে সাধে বাসাবাড়ীখানা ॥/ পঞ্চভূতের পাহারা, ভূজঙ্গিনি জিতে মরা, সহ¯্র কর্ণে যায় শুনা।/ তাঁর উপরে স্বাধিষ্ঠান, নিশান উড়ে সুন্দর একখানা, সেখানে আছে যমের থানা ॥/ সেখানে স্বাধিষ্ঠান, সাদা নিশান উড়ে একখানা, বন্ধুয়ার বাঁশরি যায় শুনা।/ ডাইনে কলব বামে রুহ, খবর তো রাখে না কেহ, সেখানে যমের ধার ধারে না ॥/ মনিপুর ভাসছে জলে, যাওয়া আসা খুব কৌশলে, ফুলটঙ্গি বানাইছে একখানা।/ অনাহত হৃদপদ্ম, দশম দল আছে বিশুদ্ধ, বৈকুণ্ঠ যে শুদ্ধ মানুষ জানা ॥/ ত্রিবেণী কণ্ঠমূলে, বিশুদ্ধ পদ্মজলে বদ্ধ হলে হরে যম যাতনা।/ দ্বিদলে কপাট ভাঙ্গিয়া, সানের বান্ধা ঘাটে গিয়া, গুরুমন্ত্র জপিতে থাকনা ॥/ তার উপরে সহ¯্রা রয়, খেলা যেদিন সাঙ্গ হয়, উড়বে পাখি মেলিয়া দুই ডানা।/ শুন বলি রে হাবিব পাগলা, দিন থাকিতে মারো তালা, নইলে কান্দন বারণ তো হবে না ॥” (কম্পিউটারে কম্পোজকৃত পা-ুলিপিতে গান নংÑ২৩৭। এই পা-ুলিপিতে একটি গানের খ-াংশকে আর একটি পৃথক গান গণ্য করা হয়েছে, সুতরাং এই গানটি তৎপরবর্তী হওয়ায় এই গানের ক্রমসংখ্যাটি প্রকৃতপ্রস্তাবে হবে ২৩৭।) তখন যে-কারও বোধোদয় হয় যে, এই কবি ‘দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানাই বাউলব্রত’ এই আত্মতত্ত্বের সাধনায় আপাদমস্তক ডুবে আছেন, যে-আত্মতত্ত্বের সন্ধান লালনের গানে পাওয়া যায়।
বাউল গানের প্রধান উপজীব্য হলো আত্মতত্ত্ব বা দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানার সাধনা । গান গানে এই তত্ত্ব প্রকাশে বিশেষ পারিভাষিক শব্দের প্রয়োজন হয়। হাবিব পাগলার উপর্যুক্ত গানে প্রযুক্ত বিশেষ বিশেষ শব্দ ও শব্দযূথ আহমদ শরীফের বয়ার্ণনানুসারে ‘বৈষ্ণব সহজিয়ার মহাভাবরূপ সহজাবস্থা’র সাধনদ্ধতির সঙ্গে সমানুপাতী। সে-সাধন পদ্ধতির প্রযুক্তিপ্রয়োগিকতাকে বিধৃত করতে শ্রীশরীফ বলেছেন, ‘হিন্দু তন্ত্রে মেরুদ-কে আশ্রয় করে পর পর ছয়টি চক্র Ñ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুরি, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞা চক্র [দ্বিদল চক্র] ও তার সন্নিহিত পদ্ম এবং ইড়া (গঙ্গা) পিঙ্গলা (যমুনা) সুষু¤œা, (সরস্বতী) প্রভৃতি বহু নারীর [এখানে ‘নারী’ স্থলে ‘নাড়ী’ হওয়াই সঙ্গত ও বাঞ্ছনীয়। মনে হয় অনভিপ্রেত মুদ্রণপ্রমাদ সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু ইড়া, পিঙ্গলা, সুষু¤œা এই তিনটিই মানব দেহের বিশেষ প্রত্যঙ্গ, এই যাকে বলে, এক একটি নাড়ী বিশেষের নাম। তন্ত্রে যেগুলো বিশেষ বিশেষ নদীর নামে অভিহিত।Ñ ই.কা.] কল্পনা করা হয়। সর্বনি¤েœর চক্রের নাম মূলাধার চক্র। এতেই সৃষ্টিরূপা কু-লিনী সুষুপ্ত রয়েছে। ষটচক্রের উর্ধে রয়েছে সহ¯্রার (সহ¯্রদলপদ্ম)Ñ তাতে থাকেন পরম শিব। যৌগিক প্রক্রিয়ার দ্বারা এই কু-লিনীকে ক্রমাগত উর্ধ্বে নিয়ে পরম শিবের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে ত্রিগুণাতীত শিবত্ব উপলব্ধ হয়। এটি এক পরমানন্দময় অন্বয় সত্তাÑ শিবশক্তির অন্বয় সত্তাÑ এই মিলনজাত কেবলানন্দই সাধকের চরম আধ্যাত্মিক লক্ষ্য। শিব পুরুষ শক্তির প্রতীকÑ উমা নারী শক্তির প্রতীকÑ উভয়ের মিলন জনিত যে সামরস্য তাই কেবলানন্দ, বৌদ্ধতান্ত্রিকের মহাসুখ ও বৈষ্ণব সহজিয়ার মহাভাবরূপ সহজাবস্থা।’ (আহমদ শরীফ, বাউলতত্ত্ব, বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৩০)।
শ্রীশরীফের বয়ান ও উদ্ধৃত গানটি পাশাপাশি পাঠ সমাপনান্তে বিদগ্ধ যে-কারও সহজেই হৃদবোধ হবে যে, গানটিতে সন্নিবেশিত বিশেষ শব্দগুলো ‘বৈষ্ণব সহজিয়ার মহাভাবরূপ সহজাবস্থা’য় উপনীত হওয়ার সাধনপদ্ধতির পারিভাষিক শব্দ। গানে ব্যবহৃত এবং এখানে বিবেচ্য শব্দ বা শব্দযূথগুলো হচ্ছে : পানির পাল, কামনদী, ত্রিবেণী, পরদা ব্যবধান, ঘর, বিদেশি নাগর, বৈঠকখানা, ফুলের মধু, চতুর্দলের আধার, শম্ভূলিঙ্গ, বাসাবাড়ি, পঞ্চভূতের পাহারা, ভূজঙ্গিনী, কর্ণ, স্বাধিষ্ঠান, সাদা নিশান, বন্ধুয়ার বাঁশি, কলব, রুহ, যম, মণিপুর, ফুলটঙ্গি, অনাহত, হৃদপদ্ম, দশমদল, বিশুদ্ধ, বৈকুণ্ঠ, শুদ্ধ মানুষ, কণ্ঠমূল, পদ্মজল, যম যাতনা, দ্বিদলে কপাট, সানের বান্ধা ঘাট, গুরুমন্ত্র, সহ¯্রা, পাখি ও তালা। গণনায় কমপক্ষে ৩৭টি শব্দ বা শব্দযূথ, প্রত্যেকটিই তন্ত্র-সুফি-মন্ত্রমতে [যেহেতু গানটিতে তান্ত্রিক শব্দ বা শব্দযূথের সঙ্গে ‘কলব’ (মন) ও ‘রুহ’ (আত্মা) অন্তত এই দু’টি সুফিতত্ত্বের শব্দ সংযোজিত হয়েছে, তাই ‘তন্ত্র-সুফি-মন্ত্রমতে’ শব্দবন্ধের অবতারণা] বিশেষ বিশেষ অর্থদ্যোতকতার অধিকারী। সবক’টির অর্থ-পরিচয় প্রদান এখানে সম্ভব নয়, কারণ লেখার বপুত্ব বেড়ে যাবে। কেবল কয়েকটি নির্বাচিত শব্দের অর্থ-পরিচয় এখানে তোলে দিচ্ছি, তা হলেই পাঠকের কাছে বোধ করি বিষয়টি স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হয়ে উঠবে, অপরদিকে হাবিব পাগলার বাউলব্রতিত্বের প্রমাণ উপস্থিত হবে এবং তৎসঙ্গে পাঠক উপলব্ধি করবেন যে, ‘পথের পার্থক্য, মতের অনৈক্য এবং সাধন পদ্ধতির বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাউল, বৈষ্ণব ও সুফীদের মধ্যে উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও পরিমাণগত মিল বর্তমান। তাই একের বাণীতে অপরের মনের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।’ অর্থাৎ প্রেক্ষিতানুসরে হাবিব পাগলা বাঊল অথবা সুফি যে-ঘরনারই (যে-কোনও একটা হওয়ার সম্ভবনা আছে, সেটা আপাতত বিবেচ্য নয়।) হোন না কেন, এই গানে তাঁর পূর্বসূরিদেরÑ যাঁরা বাউল, বৈষ্ণব অথবা সুফিÑ পরম সিদ্ধিলাভকল্পে যোগসাধনার ভাবপ্রক্ষেপণ ঘটেছে, কিন্তু সে-প্রক্ষেপণ বিকশিত ও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রাতিস্বিক স্বকীয়তার আলোয় রঞ্জিত হয়ে। প্রায় প্রতিটি গানের ভরন্তায় (ভনিতায়) নিজের নামের সঙ্গে কবি ‘পাগলা’ শব্দটি সন্নিবেশিত করেছেন, এই ‘পাগল’ শব্দেরও একটি আলাদা অর্থ (বলা বাহুল্য, বিভিন্ন পর্যালোচনায় কেউ কেউ বাউলকে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন অর্থে ‘পাগল’ কিংবা ‘ক্ষ্যাপা’ বলে অভিহিত করেছেন) আছে। আর এই গানে বাউলব্রতসাধনের নিরিখে যে-অপরূপ পাগলামি প্রকাশ পেয়েছে তাতে প্রমাণিত হয় হাবিব পাগলা পাগল বটে, তবে অনন্য এক পাগল।
হাবিব পাগলার কোনও কোনও গানের যত্রতত্র বিশেষ বিশেষ তান্ত্রিক শব্দ ও শব্দযূথের প্রাচুর্য পরিলক্ষিত হয়, নির্গলিতার্থ বোধাতীত হলেও এ-গুলো যে দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানার নিরন্তর সাধনার প্রসঙ্গপ্রাপঞ্চিক শব্দ বা শব্দযূথ তা হৃদয়ঙ্গম করতে কিন্তু কী করে জানি কোনও বেগ পেতে হয় না। উদাহরণ দিচ্ছি : মনের মানুষ, মরা গাঙ্গে জোয়ার, নদীর বাও, মায়া কুম্ভীরানী, শুদ্ধ মানুষ, তিন রকম পানি, কালনাগিনী, চুমকমনি, মাথার মনি, কলুর ডাক, দিল দরিয়ার নাইয়া, দিলালগপুর, কামিনীপুর, আসকপুর, তিন চরার মাথা, দুই খান পাল, লিলুয়া বাতাস, আড়ি কোণার সাঝ, ঈশান কোণার মেঘ, নাও, নবীর ঘাট ইত্যাদি। মাত্র কয়েকটি গান থেকে এই ক’টি শব্দ-শব্দজোট চয়িত হয়েছে। আবারও স্বীকার করছি, দু’একটি ব্যতিরেকে এইসব শব্দ-শব্দযূথের কোনওটিরই অর্থ কিংবা নির্গলিতার্থ আমার জানা নেই। ‘মনের মানুষ’কে বড়জোর ‘প্রেমিক’ কল্পনা করতে পারি, কিন্তু ‘শুদ্ধ মানুষ’-এর কোনও রূপকল্প আমার কল্পনায় প্রতীকায়িত হয় না। অথচ হাবিব পাগলার চেতনায় এইসকল শব্দের প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট অর্থমূর্তি প্রতীকায়িত ছিল। সব গান থেকে সন্ধান করে এবংবিধ শব্দ ও শব্দযূথ চয়ন করলে তার সংখ্যা প্রচুর হবে সন্দেহ নেই।
আহমদ শরীফের ‘বাঊলতত্ত্ব’ (বুকস্ ফেয়ার ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৪) পুস্তকে সংযোজিত ‘শব্দার্থ ও টীকা’ (পৃষ্ঠা : ২০৩Ñ ২১৬) অংশে বিশেষ বিশেষ তান্ত্রিক শব্দ ও শব্দযূথের অর্থ-পরিচিতি প্রদান করা করা হয়েছে। নি¤েœ হাবিব পাগলার ২৩৬/২৩৭ নং গানের কয়েকটি শব্দের অর্থ কিংবা কিঞ্চিৎ পারিভাষিক পরিচিতির বয়ার্ণনা, পাঠকদের সুবিধার্থে ক্ষেত্রবিশেষে অনেকটা স্বকীয় প্রকরণানুসারে উদ্ধৃত হলো । উদ্ধৃতকরণের মূল তাৎপর্য এই যে, হাবিব পাগলার জাপিত জীবনে দেহাধারস্থিত আত্মাকে জানার নিরন্তর সাধনা চর্চাকে উপস্থাপন করা, বাস্তববুদ্ধির নিকষে ঘষে এইসব নৈগুমার্থিক প্রসঙ্গপ্রপঞ্চসমূহের বিশ্লেষণ করা নয়। বলা বাহুল্য, বাউলতত্ত্বের বৈশ্লেষণিক উপস্থাপনের যোযগ্যতা আমার নেই, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমার মতো মূর্খের পক্ষে মোটেও তা সম্ভব নয়, আমি কেবল প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে যৎকিঞ্চিৎ বয়ার্ণনা পরিবেশন করে ক্ষান্ত হয়েছি।
পদ্ম : হিন্দু ষটচক্রে এবং বৌদ্ধ চতুর্চক্রে বিভিন্ন সংখ্যক দলের এক একটি পদ্মের স্থিতি …। অপর অর্থে যোনী। ‘চক্র’-এর অর্থ করা হয়েছে : ‘লতিফা, ষটচক্রÑ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞাচক্র (হিন্দুতন্ত্রে)। নির্বাণ, ধর্ম, সম্ভোগ, ও সহজচক্রÑ বৌদ্ধতন্ত্র)।’ যেমন মূলাধার অর্থে ‘গুহ্যদ্বার ও লিঙ্গ মধ্যস্থল’ নির্দেশিত হয়েছে। যেখানে ‘একটি চক্র ও পদ্ম অবস্থিত’ এবং ‘সৃজনী-শক্তি-স্বরূপা কামময়ী সুপ্তা কু-লিনী’র স্থিতি। যা ‘কুল-কু-লি-লিনী’ (কু-লীকৃত সর্পিণী কামের প্রতীক) নামে অভিহিত। ‘কু-লিনীর সৃজনীশক্তি রোধ করে তাকে উর্ধ্বে সঞ্চালিত করে সহ¯্রায় স্থিত পরম শিবের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াই হচ্ছে সহজিয়া ও বাউল সাধনা। কু-লিনী শক্তির অবয়বী রূপ হচ্ছে বিন্দু।’
ফুল : রজঃপ্রবৃত্তি। রজঃ-এর আবির্ভাবকে ‘ফুল’ ফোটা বলে। ফুলের উদ্গমে যেমন ফলের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, তেমনি রজঃ-এর আবির্ভাবে সন্তান ধারণের সম্ভবনা দেখা দেয়। এই সাদৃশ্য বশতই রজঃকে ফুল বলে। সৃষ্টির ফুল।
ঘাট : কাম-নদীর ঘাট; ত্রিবেণীর (ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষু¤œার মিলন স্থল) ঘাট প্রভৃতি জ্ঞাপক রূপক অভিব্যক্তি।
সগ¯্রা : সহ¯্রদল বিশিষ্ট উষ্ণীষ পদ্ম। এখানেই ‘সহজানন্দ’ পরম শিব, আত্মা বা পরমাত্মার স্থিতি।
মনিপুর : মূলাধার, কামের অবাস। এটি দশদল পদ্মবিশিষ্ট।
তিরপিনী (ত্রিবেণী) : সাধনতত্ত্বে ইড়া-পিঙ্গলা ও সুষু¤œা নাড়ীর মিলনস্থল যেখানে রুদ্ধ ও উর্ধ্বেচালিত বিন্দু গিয়ে পড়ে। তন্ত্রে এই বিন্দু শুক্র অর্থে গৃহীত। ‘শব্দার্থ ও টীকা’র ‘বিন্দু’ ভুক্তিতে পাই : “শুক্র। এই শুক্রতেই সৃষ্টিশক্তি নিহিত। এই শক্তিই আত্মাস্বরূপ তথা পরমাত্মার অংশ। সৃষ্টিরোধ করলে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, অমরত্বের প্রত্যাশী সাধকেরা তাই সৃষ্টির পথরোধ করতে চায়। বিন্দু তথা শক্তি তথা আত্মাকে উর্ধ্ব উত্তোলন করে নিষ্ক্রিয় করে রাখাই এই মতবলম্বীদের ব্রত। তাই বিন্দু ধারণই এই মতের ভিত্তি।”
দ্বিদল : দ্বিদল বিশিষ্ট আজ্ঞাচক্র ভ্রƒদ্বয়ের মধ্যস্থলে অবস্থিত। হাকিনী ও পরশির-এর এত অধিষ্ঠান।
চতুর্দল : গুহ্যদেশ ও জননেন্দ্রিয়ের মধ্যস্থ মূলাধার ষটচক্রেরএকটি চক্র। এখানে স্থিত পদ্মটি চতুর্দল।
আম ও হাতের গল্প
আপাপতত এইটুকু পর্যন্ত। বাউল হাবিব পাগলার ভাবসমুদ্রের অপরূপ স্থাপত্য ফুলটঙ্গি ঘরের বয়ার্ণনা পাঠপ্রকরণের প্রযতেœ আমি নিজেকে শ্রবণ করিয়েছি মাত্র, এর প্রতিমূর্তি কিংবা রূপবৈচিত্র্য চেতনার আয়নায় প্রতীকায়িত করতে সমর্থ হই নি, উপলব্ধি তো দিল্লি দূরস্থ। এর বেশি অগ্রসর হওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। ভুলে গেলে চলবে না যে, লোকে বলে ‘আতের থাক্যা আম বড় অইয়্যা গেলে চিপ্যা খাওন যায় না।’ অর্থাৎ আম নিংড়ে রস খেতে হলে হাতের মাপের চেয়ে আম বড় হলে চলে না, হাতের মাপের চেয়ে আমটিকে অবশ্যই ছোট হতে হয়।
সুনামগঞ্জ ॥ ১১ ডিসেম্বর ২০২১।