হাসান শাহরিয়ার : হাওর ছিল যার অন্তরজুড়ে

অজয় দাশগুপ্ত
বয়স ও পেশাগভাবে অগ্রজ, কেবল দেশের গণ্ডিতে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান হাসান শাহরিয়ার। অথচ আমাদের সঙ্গে শুধু নয়, তাঁর সন্তানতুল্যদের সঙ্গেও মিশতেন এমনভাবে- যেন সমবয়সী। আমি তাঁর জন্মস্থান সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দু’বার গিয়েছি। একবার ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি, জামালগঞ্জ থেকে হেঁটে শনিরহাওর পাড়ি দিয়েছি। মাঠে তখন সবুজ বোরো ধান। জমির আইল ধরে ধরে এগিয়েছি। স্থানীয় পথপ্রদর্শক সঙ্গী না থাকলে নিশ্চিত বলতে পারি- পথ হারাতাম। আরেকবার, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ থেকে ট্রলারযোগে প্রায় সারাদিন সমুদ্রসম জলরাশি অতিক্রম করে বিকেলের দিকে পৌঁছাই তাহিরপুরের টেকেরঘাটে- চুনাপাথরের খনি এলাকায়। এ ঘটনা জেনে হাসান শাহরিয়ার হেসে বলেছিলেন- ‘অজয়, তোমাকে হাওর অঞ্চলের অস্থায়ী নাগরিকত্ব দেওয়া যেতে পারে।’ প্রকৃতপক্ষে হাওর ছিল তাঁর অন্তরজুড়ে। ‘সমকাল’ পত্রিকায় যতদিন কাজ করেছি, তাঁর অনেক লেখা প্রকাশ করেছি। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী তাঁর নখদর্পণে ছিল। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে তাকে লেখা দিতে অনুরোধ করার পর বেশি অপেক্ষা করতে হতো না- নিজেই লেখা নিয়ে হাজির হতেন। কিন্তু হাওর এলাকায় কিছু ঘটলে বলতে হতো না, নিজেই লেখা নিয়ে হাজির হতেন। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রবল পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকার ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছিল। তিনি এ ক্ষতিকে নিজের ক্ষতি মনে করেছেন। একাধিক লেখায় কীভাবে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়, তার পথনির্দেশনা দিয়েছেন। হাওর নিয়ে ছিল তাঁর অনেক পরিকল্পনা। এখানের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য লেখনী চালিয়েছেন। মাছ উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছেন। নদ-নদী খননের ওপর জোর দিয়েছেন। বন্ধু-পরিচিতজনদের হাওরগুলোতে বর্ষায় সফর করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। পূর্ণিমার রাতে হাওরের জলরাশিতে নৌকায় কাটাতে বলেছেন। হাসান শাহরিয়ার না থাকলেও তাঁর অনুগামীরা এ দায়িত্ব পালন করবেন, এটা আশা করতে পারি।


নিউজউইক পত্রিকায় কাজ করতেন তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ পত্রিকাটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ-এর পক্ষে কলম ধরেছিল। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যায় নিউজউইক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আখ্যায়িত করেছিল ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ হিসেবে, যা আজ সর্বত্র রেফারেন্স। হাসান শাহরিয়ার ভাই ‘নিউজউইক-এ বাংলাদেশ : মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় এবং তারপর’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ নিয়ে যে সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রতিটিই স্থান পেয়েছে। ১৯৮১ সালে নিউজউইকে যোগদানের পর তাঁর যে সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোও স্থান পেয়েছে। সব প্রতিবেদনই বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রন্থটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সন্দেহ নেই। ২০১৪ সালের ২৬ মে এ মূল্যবান গ্রন্থের কপি আমাকে প্রদানের জন্য তিনি আমার অফিসে হাজির হয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘অজয় দাশগুপ্ত- বন্ধুবরেষু’। আমি অভিভূত, আপ্লুত হয়েছি। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি।
প্রয়াণের দিনে অগ্রজ কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতি জানাই প্রণতি। আপনি থাকবেন আমার মতো অনেক অনেক মানুষের হৃদয়ে, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হয়ে।
লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক।