১১ মার্চ ১৯৭১- জনগণ অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১-এর রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ চতুর্থ দিবস। সারাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাত্মক অসহযোগ পালন করে। গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। কোনো গণশত্রু বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুরু করেন।
এদিন বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সব রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন। লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবাই একসাথে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করুন। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনরকম বিরোধ থাকা উচিত নয়। জনগণ এখন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে’।
অপরদিকে জাতীয় লীগপ্রধান আতাউর রহমান খান সামরিক সরকারের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এক রাষ্ট্রের জোয়ালে আবদ্ধ না থাকলেও দুটি স্বাধীন ভ্রাতৃরাষ্ট্র হিসেবে আমরা পরস্পরের এবং বিশ্বের এই অংশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারব।’
ন্যাপপ্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব খুরশীদ হক, পশ্চিম পাকিস্তানের কাম্বেলপুর থেকে নির্বাচিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন, ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন।
এদিকে সদ্য ঢাকা ত্যাগকারী এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচি প্রত্যাবর্তন করে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, কুর্মিটোলাস্থ ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনের সচিব ও কর্মকর্তারা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছেন। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেব প্রদত্ত শর্তগুলো মেনে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। একই দিন বঙ্গবন্ধুর নিকট পিপিপির নেতা ভুট্টো একটি তারবার্তা দিয়ে ঢাকায় আসতে রাজি হওয়ার কথা জানান।
ছাত্র ইউনিয়ন স্বাধীন পূর্ব বাংলা কায়েমে জনগণের প্রতি সংগ্রামের আহ্বান জানায়। সংগ্রামে সফলতার জন্য সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রাম শক্তির একতা গঠনের উপর জোর দেয়।
স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃচতুষ্টয় এক বিবৃতিতে সামরিক সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব, উপাধি বর্জনের আহ্বান জানান। কবি আহসান হাবিব, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সহ অনেক খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব আন্দোলনের সমর্থনে তাদের খেতাব অর্জন করেন। গণহত্যার প্রতিবাদে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর পাকিস্তান সরকারের এক চিত্রপ্রদর্শনীতে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি তিনি দেশের চিত্রশিল্পীদেরও যোগদানে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এদিন কুমিল্লা কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে এদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৩ কয়েদী। অন্যদিকে বরিশাল কারাগার ভেঙে ২৪ কয়েদী পালিয়ে যায় এবং এ সময় ২ কয়েদী ও কুমিল্লায় ৩ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক সভায় মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন দেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আবেদন জানানো হয়। গণআন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের একদিনের বেতন আওয়ামী লীগের ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সমরাস্ত্রসহ ১০ মার্চ একটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে নোঙর করে। এর প্রতিবাদ জানিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদে’র চার ছাত্রনেতা জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীর চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সহযোগিতা না করার অনুরোধ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ছাত্রনেতারা শর্তারোপ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ইয়াহিয়া প্রদত্ত ৬ মার্চের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে প্রতিদিন একের পর এক নির্দেশ জারি অব্যাহত রাখেন। এদিন থেকে কিছু বিষয় হরতালের আওতামুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। যেমন- ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক যেসব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে, সেগুলো সাপেক্ষে ছুটির দিনসহ নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। মজুরি ও বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সার্টিফায়েড পে বিলের মাধ্যমে তা করতে হবে। এ ছাড়াও কৃষি তৎপরতা, বন্দর পরিচালনা, ইপিআইডিসি ফ্যাক্টরি পরিচালনা; সাহায্য, পুনর্বাসন ও পল্লী উন্নয়ন কাজ, প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে এজি অফিস আংশিক সময় খোলা রাখা, কারাগারের ওয়ার্ড অফিস খোলা রাখা, আনসারদের দায়িত্ব পালন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ চালু রাখতে সংশ্নিষ্ট দপ্তর খোলা রাখাসহ সব ইন্স্যুরেন্স অফিস খোলা রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
১লা মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাগজ পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো বন্ধ হওয়ায় নিউজপ্রিন্টের অভাবে এদিন থেকে ডন পত্রিকা সহ সেখানকার বিভিন্ন সংবাদপত্রের কলেবর ব্যাপক হ্রাস পায়। এদিকে ৩২ হাজার টন গমভর্তি জাহাজ ‘ভিনটেজ হরিজন’ ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও গতিপথ পরিবর্তন করে করাচি অভিমুখে যাত্রা করে।
১১ মার্চ রাতে এক বিবৃতিতেপূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, জনগণের আন্দোলন দুর্বার গতিপ্রাপ্ত হয়েছে। সর্বস্তরের জনগণের দ্বারা প্রদর্শিত সর্বোচ্চ চেতনাবোধই আসলে সকল প্রেরণার উৎস। সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, অর্থনীতি পুরোদমে সচল রাখার জন্য সর্বোচ্চ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। ক্ষুধার্ত জনগণের দুর্ভোগ এবং অর্থনীতি ধ্বংসের যে কায়েমী স্বার্থ ও গণবিরোধী ষড়যন্ত্র তা বানচাল করতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর তা করার জন্য, আমাদের জনগণকে সকল প্রকার উৎপাদনের জন্য তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত সকলের জনগণের কল্যাণে বিজয়ের জন্য কঠোর শৃঙ্খলা প্রদর্শন করতে হবে।