১৫ মাসের সাংসদ ছিলেন শাহীনুর পাশা, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ছিলো অনেক

বিশেষ প্রতিনিধি
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, হেফাজতে ইসলামের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশ চৌধুরী সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-দক্ষিণ সুনামগঞ্জ) আসনের ১৫ মাসের সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০৪ সালের ২৭ এপ্রিল সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর ২০০৫ সালের ২০ জুলাই সুনামগঞ্জ-৩ আসনে উপনির্বাচনে শাহীনুর পাশা চৌধুরী চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৫ মাসের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা শাহীনুর পাশর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়ম দুর্নীতির সঙ্গে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে মেয়াদ শেষ হবার পরপরই। এরপর প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়। গ্রেপ্তারী পরোয়ানাও জারি হয়। অবশ্য পরে তিনি এসব মামলায় জামিনও পান।
আবাসন ব্যবসার কথা বলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রতারণা করে ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৮ সালে ১৩ ডিসেম্বর মামলা হয় শাহীনুর পাশার বিরুদ্ধে। সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত এই মামলায় পরোয়ানাও জারি করেন।
মামলার বাদী ঢাকার বনানীর বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী তালুকদার যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর আদালতে তিনি প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছিলেন। বাদীর অভিযোগ ছিল, শাহীনুর পাশার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে তাঁর পরিচয় হয়। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে তাঁর ‘মাতৃভূমি হাউজিং ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’ এর নামে একটি আবাসন প্রকল্প আছে জানিয়ে ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মোহাম্মদ আলী তালুকদারকে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হওয়ার প্রস্তাব দেন। মোহাম্মদ আলী ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর থেকে কয়েক দফায় ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু শাহীনুর পাশা তাঁকে না জানিয়ে একপর্যায়ে প্রকল্পটি বিক্রি করেন। এরপর থেকে বারবার যোগাযোগ করলেও শাহীনুর টাকা দেননি। পরে শাহীনুর টাকা পরিশোধের জন্য ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের একটি চেকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। একই ব্যাংকের ভিন্ন ভিন্ন তারিখে আরও তিনটি চেকসহ মোট ২০ লাখ টাকার চেক দেন। কিন্তু এসব চেক নগদায়নের জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখায় জমা দিলে ডিজঅনার হয়। এরপর শাহীনুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি জানান, ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকার লভ্যাংশসহ ফেরত দেবেন। পরে তিনি পাওনা টাকার কথা অস্বীকার করেন।
প্রতারণা মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। শেষে বাদীর সঙ্গে আপস করে নগদ ১০ লাখ টাকা ও বাকি টাকার চেক প্রদান করায় আদালত তাকে জামিন দেন। একই বছরের ২২ ডিসেম্বর মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদ্যুতায়নের নামে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জ বাজারে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ করেন উপজেলার আসামপুর গ্রামের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল আউয়াল।
প্রবাসী আব্দুল আউয়াল অভিযোগ করে বলেছিলেন, ২০০৫ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালীন মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরীর সাথে যুক্তরাজ্যে তার পরিচয় হয়। সেই সুবাদে প্রবাসী আব্দুল আউয়াল তাঁর নিজ গ্রাম আসামপুরে বিদ্যুতায়নের জন্য সংসদ সদস্য শাহীনুর পাশাকে একটি সংবর্ধনা প্রদান করেন এবং বিদ্যুতায়নের খরচের জন্য একটি চেকের মাধ্যমে এক লক্ষ টাকা প্রদান করেন। কিন্তু শাহীনুর পাশা চৌধুরী সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে আসামপুর গ্রামে বিদ্যুতায়ন হয়নি। পরে শাহীনুর পাশা চৌধুরীর কাছ থেকে সেই এক লাখ টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হন যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল আউয়াল।
ওই সময়ে মাওলানা শাহীনুর পাশা অবশ্য বলেছিলেন, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার, নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
এসব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি বলেছিলেন,‘ নির্বাচনে আমার জনপ্রিয়তা দেখে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে মিথ্যা অপপ্রচার করছে। বিদ্যুতের কথা বলে আমি কারও কাছ থেকে টাকা নেইনি।’
শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে সিলেট নগরীর বনকলাপাড়া থেকে হেফাজত নেতা শাহীনুরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকার সিআইডির একটি দল। সিলেটের বিমানবন্দর থানার ওসি খান মোহাম্মদ ময়নুল জাকির জানান, রাতেই তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়।