২৯৬ শিক্ষক কর্মচারী’র মানবেতর জীবন যাপন

বিশেষ প্রতিনিধি
এমপিওভুক্ত হয় নি সুনামগঞ্জ জেলার এমন ৩৭ টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা করোনাকালে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ২৯৬ জন শিক্ষক কর্মচারী’র কেউই বেতন পান নি। এই অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন এসব শিক্ষকরা।
বুধবার সকালে এই প্রতিবেদকের ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারে একজন কলেজ শিক্ষক ম্যাসেজ পাঠিয়ে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি (এমএ পাস) নিয়ে এলাকার কলেজে এসে চাকুরি নিয়েছি। ভরসা ছিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হবে। এখানেই জীবন কাটিয়ে দেব। এখন চাকরির বয়স শেষ। কলেজটিও এখনো এমপিওভুক্ত হয় নি। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কলেজ থেকে যে সামান্য বেতন দেওয়া হতো, সেটিও পাই নি। সংসারে মা-বাবা নিজের স্ত্রী ও একটি শিশু সন্তান রয়েছে। দুয়েকটি টিউশনি ছিল, এগুলোও এখন নেই। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানিয়ে দিয়েছেন, এখন পড়াতে হবে না। প্রধানমন্ত্রীর করোনা সহায়তার ৫ হাজার টাকা ছাড়া এই সময়কালে উপার্জনের কোন টাকা হাতে আসে নি। অন্য কোন কাজও করতে পারছি না, নিজের জীবন এবং সংসারের অন্যদের জীবন বাছাই কীভাবে? কাউকে বলাও যাচ্ছে না এসব কথা। তিনি লিখেছেন, কেবল আমি একা নয় সুনামগঞ্জের ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের সকলেরই একই অবস্থা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বৃহৎ এলাকা সুরমার উত্তরপাড়ের বৈশারপাড়ে মতিউর রহমান কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান। ২০১১ সাল থেকে রাজনীতিবিদ মতিউর রহমান এলাকাবাসীর সহযোগিতায় আশাজাগানিয়া এই প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে আসছেন। এখনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ভীষণ বিপাকে পড়েছেন কলেজের ৯ জন শিক্ষক ও একজন নৈশপ্রহরী।
কলেজের একজন শিক্ষক বললেন, এমন কষ্টের মধ্যে পড়েছি, যা কাউকে বলার মতো নয়। ডিসেম্বরের পর আর বেতন পাই নি। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ৫ হাজার টাকা ছাড়া এই ১০ মাসে আমার কোন আয় নেই।
কলেজের অধ্যক্ষ মশিউর রহমান বলেন, কলেজের ৩০০ শিক্ষার্থী বেতন দিচ্ছে না। করোনাকালে পাঠদান বন্ধ থাকায় বেতনের জন্য চাপও দেওয়া যাচ্ছে না। এখন ছাত্র ভর্তির কিছু টাকা পাওয়া গেছে। কলেজ পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে আশ^াস দেওয়া হয়েছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করা হবে।
কেবল মতিউর রহমান কলেজ নয়। এরচেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে জেলার অন্য আরও ৫ টি ননএমপিও কলেজ, ২১ টি মাধ্যমিক স্কুল ও ১০ টি মাদ্রাসা।
শহরতলির শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫২১ জন। বিদ্যালয়ের জেএসসি ও এসএসসি’র বিগত সময়ের ফলাফলও প্রশংসা করার মতো ছিল। এই বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত এমপিওভুক্ত থাকায় শিক্ষক কর্মচারীসহ ১১ জন করোনাকালে সরকারি অংশের বেতন পেয়েছেন। কিন্তু নবম ও দশম শ্রেণিতে পাঠদানকারী খ-কালিন শিক্ষকরা মার্চ মাসের পর আর কোন বেতন পান নি। কেবল প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সহায়তার ৫ হাজার টাকা পেয়েছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বললেন, ৮ মাস হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেতন দিচ্ছে না। আমরাও খ-কালীন শিক্ষকদের কোন টাকা দিতে পারছি না। অন্য শিক্ষকদেরও বিদ্যালয় অংশের টাকা দেওয়া যাচ্ছে না। একারণে ভীষণ বেকায়দায় খ-কালীন শিক্ষকরা।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, সুনামগঞ্জে ২১ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১০ টি মাদ্রাসা ও ৬ টি কলেজ এমপিওভুক্ত হবার মতো রয়েছে। এগুলো এখনো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় করোনাকালে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৯৬ জনের মতো শিক্ষক কর্মচারী মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমি মনে করি তাঁদের প্রণোদনা দিয়ে বা বিশেষ কোন প্রকল্প থেকে সহায়তা দিয়ে বিপদকালীন সময়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।