৬২ ধর্ষণের রিপোর্টই নেগেটিভ, নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করলে অপরাধ বেড়ে যাবে

ধর্ষণ মামলা প্রমাণের জন্য মেডিক্যাল সার্টিফিকেট একটি অন্যতম প্রধান উপকরণ। যথাযথভাবে পরীক্ষা করা না গেলে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হল- নির্যাতিতা ও ধর্ষিতা নারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় অসচেনতনতা বা অন্য কারও অবহেলার কারণে এই মোক্ষম মেডিক্যাল সার্টিফিকেটটি সঠিকভাবে পান না। মঙ্গলবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ‘৬২ ধর্ষণের রিপোর্টই নেগেটিভ’ শিরোনামের খবরে বলা হয়েছে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গত ৬ মাসে ৬২ টি ধর্ষণ আলামত পরীক্ষা করা হয়েছে যার সবগুলোতেই নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। অর্থাৎ এই ৬২টি ঘটনায়ই ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। শতভাগ ক্ষেত্রে নেগেটিভ রিপোর্ট আসা বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনার বিষয় বৈকি। পুলিশ সুপার বলেছেন, সাজানো মামলার কারণে ধর্ষণ মামলার তদন্ত একটি বড় বাধা। তিনি বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে অনেক সময় ধর্ষণ মামলা দেয়া হয়। তাঁর কথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে দায়েরি মামলা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা থেকেও এ কথার বাস্তবতা পাওয়া যায়। কিন্তু এরূপ ঘটনা শতভাগ ক্ষেত্রে ঘটে এমন ভাবার কোন কারণ নেই। বরং আমাদের চারপাশের বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় সমাজে এখনও নারী নির্যাতনের বিষয়গুলো প্রবলভাবে উপস্থিত আছে। বরং জনসমক্ষে বা আইন-আদালত পর্যায়ে খুব কম সংখ্যক নির্যাতনের ঘটনাই আসে। যেগুলো আসে সেগুলোও যদি মেডিক্যাল সার্টিফিকেট বিড়ম্বনার কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে দুর্ভাগ্যজনক। বিষয়টি নিয়ে সক্রিয়ভাবে ভাববার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ধর্ষণ ঘটনাকে ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণের জন্য আলামত সংরক্ষণ একটি বড় বিষয়। ভুক্তভোগীরা জানে না কেমনভাবে আলামত সংরক্ষণ করতে হয়। ধর্ষণের সময় পরিধেয় বস্ত্র একটি বড় উপাদান। শরীর ধোয়ামুছা না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে দ্রুত আসা দরকার। ডাক্তাররা বলেছেন, ৪৮ ঘণ্টা পর ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে পড়ে। যিনি ধর্ষণের শিকার হন তিনি বা তার পরিবার এতকিছু মনে রেখে মাথা ঠা-া রেখে ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে পারবেন এমনটি চিন্তা করা আমাদের সামজিক বাস্তবতায় কঠিন। এছাড়া আলামত নষ্ট করে দেয়ার একটি চেষ্টাও চালু থাকে। প্রতিটি হাসপাতালে ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিরও অভাব রয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান বলেছেন, হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) স্বয়ংসম্পূর্ণ টিম নেই। রেডিওলজি বিভাগও সক্রিয় নয়। পরীক্ষাগারের এই সীমাবদ্ধতাও ধর্ষণের রিপোর্ট নেগেটিভ আসার আরেকটি কারণ বলে আমরা মনে করি। পরীক্ষাকারী চিকিৎসক ও পুলিশের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি বলেছেন, এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাহিরপুরে তারা ভিকটিমের আলামত থানা হেফাজতে রেখে সময় ক্ষেপণ করেছেন।
নারীরা এমনিতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজমনস্কতায় অধস্তন অবস্থানে রয়েছেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা নির্যাতনের শিকার হন বেশি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক হীন অবস্থার কারণে আইন ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মত ক্ষমতা রাখেন না তারা। ফলে নির্যাতনের পর প্রতি পদে তারা আরও হেনস্তার শিকার হন। অথচ এই জায়গায় তদন্তকারী সংস্থা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও অপরাপর প্রতিষ্ঠানের অধিকতর সংবেদনশীল ভূমিকা কাম্য। এটি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই দেশে নারী নির্যাতন বিরোধী শক্ত আইন থাকলেও নির্যাতনকারীর সাজা হয়ে থাকে খুব কম ক্ষেত্রেই। এই অবস্থার পরিবর্তন কাম্য।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গত ৬ মাসে পরীক্ষা করা ৬২ ধর্ষণ ঘটনার সবগুলো রিপোর্টই কেন নেগেটিভ আসল তা খতিয়ে দেখা উচিৎ। এছাড়া ধর্ষণ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ায় পুলিশের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। একটি স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করতে পারলে আইন থাকলেও নির্যাতকের সাজা হরে না, পক্ষান্তরে নারী নির্যাতনের সংখ্যাও বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।