৯ কোটি টাকা জলে

বিশেষ প্রতিনিধ
শাল্লার প্রত্যন্ত জনপদে ৩০ টির মতো অপ্রয়োজনীয় সেতু করে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকা জলে ফেলা হয়েছে। এগুলোর কোনটিরই অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই বছরের পর বছর ধরে। বেশিরভাগ সেতু তৈরি হবার পরই অ্যাপ্রোচ সড়ক করা হয় নি। কোন কোনটির নীচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে ডুবন্ত সড়ক হয়েছে। বর্ষায় এই সেতুগুলো মরণফাঁদে পরিণত হয়। ট্রলার বা নৌকা সেতুর উপর দিয়ে ওঠলে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনেরা বললেন, কার স্বার্থে সরকারের বিপূল পরিমান টাকার অপচয় করা হয়েছে, তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস কর্তৃক গত প্রায় ১০ বছরে ৩০ টির মতো গ্রামীণ যোগাযোগ সেতু হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সেতুগুলোর মধ্যে উপজেলার সুখলাইন গ্রামের পাশের ২ টি, গিরিধর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ১ টি, আনন্দপুরের ১ টি, হবিবপুরের ২ টির মধ্যে ১ টি, আগুয়াই- নোয়াহাটির ১ টি, শ^াসখাই
১ টি, মামুদনগর ১ টি, ইসাকপুর ১ টি, কাদিরপুরের সামনে ১ টি, মার্কুলির খালে ১ টি, গ্রাম শাল্লায় ১ টি এবং রূপসা গ্রামের ১ টি সেতু তৈরি হবার পর থেকেই অ্যাপ্রোচ বিহীন। অথচ. এসব সেতু তৈরি করতে ৩০ থেকে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
উপজেলার মনোয়া গ্রামের আনিসুল হক চৌধুরী মুন বললেন,‘উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের পাশে একটি ছোট কালভার্ট হলে হতো। কিন্তু করা হয়েছে সেতু। এই সেতু ৫ বছর হয় কোন কাজে আসছে না। বরঞ্চ বর্ষায় নৌকা চলাচলে বিপদ হয়। শাল্লা গ্রামের পশ্চিম দিকে করা সেতুর পাশ দিয়ে ডুবন্ত সড়ক হয়েছে। এই সেতু এখন অকারণে দাঁড়িয়ে আছে। রূপসা গ্রামের পাশের আরেক সেতু ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। নেই অ্যাপ্রোচ সড়ক। ২ বছর আগে উপজেলা সদরের পাশে সুখলাইন গ্রামে ২ সেতু করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ কার্যালয় থেকেই সরকারের মাল যে গঙামে ঢালা হয়েছে, সবার নজরে পড়ে।’
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বললেন,‘এক শ্রেণির টাউট ঠিকাদার, প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজসে সরকারের এই টাকার অপচয় ও লুটপাট হয়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীরা মনে করে শাল্লা প্রত্যন্ত এলাকা যা খুশি তা করলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে যাবে না।’
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কেন এই সেতুগুলো করা হয়েছে, কেউ জানে না। অনেক স্থানে ২ লাখ টাকা খরচ করলে মাটির সড়ক করা যায়। করা হয়েছে ৩৩ লাখ টাকার সেতু। পানি নিস্কাশনের জন্য সেতু করা হয়ে থাকে। কিন্তু এমনও সেতু আছে, ওই পথ দিয়ে পানি নিস্কাশনের প্রয়োজনই নেই। বর্ষায় এগুলো মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায় ট্রলার বা নৌকা লেগে ফেটে যায় বা ডুবে যায়। এসব সেতু না করে এই টাকা দিয়ে হাওর থেকে ধান ঘরে আনার সড়ক করলে, মানুষের উপকারে আসতো। এই টাকার অপচয় কেন হয়েছে, কারা করেছে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।
শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সরকার মো. ফজলুল করিম বললেন, ৩০ টির মতো সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই, এটা সত্য। বর্ষায় এগুলো বিপদ হয়ে দাঁড়ায় এটাও ঠিক। তবে এগুলো মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য করা হয়েছিল। শাল্লার সিংহভাগ এলাকা বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকে। যখন সেতু করা হয়েছিল, তখন হয়তোবা সড়ক ছিল। পানির তীব্রতায় বা ঢেউয়ে সড়ক হয়তো ভেসে গেছে। এখন দাঁড়িয়ে আছে কেবল সেতু। আমরা দেখেছি গত ১০ বছরে ১৬ থেকে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে হওয়া ৩০ সেতুর কোন কোনটিতে একেবারেই অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। কোনটিতে অ্যাপ্রোচ থাকলেও চলার উপযোগী নেই। সেতুগুলোর ২ পাশে অ্যাপ্রোচ সড়ক করার জন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে এই কাজ হবে। বরাদ্দ আসলেই কাজ শুরু করবো আমরা।